প্রেক্ষাপট হালের জাসদ: বহুদা বিভক্তি ও আদর্শচ্যুতি (১)

ফিরোজ আলম মিলন:  বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়ের নাম। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর দলটির আত্মপ্রকাশ। লক্ষ্য ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং শোষণ-বঞ্চনামুক্ত সমাজ নির্মাণ। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাসদের আবির্ভাব ছিল একদিকে তীব্র প্রতিবাদের প্রকাশ, অন্যদিকে রাষ্ট্র ও সমাজের মৌলিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ।

কিন্তু পাঁচ দশকের বেশি সময় পেরিয়ে আজ জাসদের দিকে তাকালে প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ, রাজনৈতিক কৌশল ও বর্তমান অবস্থানের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। জাসদের জন্ম হয়েছিল আওয়ামী লীগের ভেতরের একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে। স্বাধীনতার পর ছাত্রলীগের সিরাজুল আলম খানপন্থী অংশের সঙ্গে আওয়ামী লীগপন্থী অংশের বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। সেই ধারাবাহিকতায় ৩১ অক্টোবর ১৯৭২ মেজর (অব.) এম এ জলিল ও আ স ম আবদুর রবকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে জাসদ আত্মপ্রকাশ করে।

দলটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজের রূপান্তর। প্রথম কাউন্সিলে এম এ জলিল সভাপতি, আ স ম আবদুর রব সাধারণ সম্পাদক এবং শাজাহান সিরাজ যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।

সে সময়ের জাসদ ছিল প্রচলিত ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে থাকা একটি উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক শক্তি। দুর্নীতি, বৈষম্য, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নানা সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে তারা তীব্র অবস্থান নেয়। তরুণদের একটি অংশের কাছে জাসদের রাজনীতি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু বিপ্লবী রাজনীতির যে তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটিকে দীর্ঘস্থায়ী, গণমুখী ও ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনে রূপান্তর করা সম্ভব হয়নি। বরং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নেতৃত্ব ও কৌশলগত প্রশ্নে মতবিরোধ প্রকট হতে থাকে।জাসদের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য হলো তার ধারাবাহিক ভাঙন। একটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকা গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে স্বাভাবিক। কিন্তু মতপার্থক্য যখন বারবার সাংগঠনিক বিচ্ছেদে রূপ নেয় এবং একই রাজনৈতিক ঐতিহ্য থেকে একাধিক দল, উপদল ও নেতৃত্বের জন্ম হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে রাজনৈতিক সংগঠনের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্বের সংস্কৃতি এবং আদর্শিক সংহতি নিয়ে।

জাসদের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটেছে। আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে এক ধারা, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে আরেক ধারা, পরবর্তীতে শরীফ নুরুল আম্বিয়া ও নাজমুল হক প্রধানদের নেতৃত্বে পৃথক সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে ওঠে। যখন ১৯৯৬ এর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী আসম আব্দুর রব তখন ১৯৯৭ সালে রব ও ইনুর নেতৃত্বাধীন অংশের মধ্যে ঐক্যের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই ঐক্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ২০০১ সালে আবার মতাদর্শিক বিরোধে বিভাজন ঘটে। পরে ইনুর নেতৃত্বাধীন জাসদ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে যোগ দেয়।এখানেই জাসদের রাজনৈতিক যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। ইতোমধ্যে মূল জাসদ থেকেই বাসদের সৃষ্টি। সেই বাসদও আবার হলো বিভক্ত।

যে দল একসময় রাষ্ট্রক্ষমতার প্রচলিত কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের কথা বলেছিল, সেই দলের একটি প্রধান ধারা পরবর্তীকালে নির্বাচনী জোট ও সংসদীয় ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হয়ে ওঠে। জোট রাজনীতি নিজে কোনো রাজনৈতিক অপরাধ বা আদর্শচ্যুতির প্রমাণ নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য জোট গঠন করতেই পারে। কিন্তু একটি দলের ঘোষিত আদর্শ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলের মধ্যে যখন দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়, তখন সেই পরিবর্তনের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করার দায়িত্বও দলের ওপর বর্তায়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অংশ হিসেবে জাসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনটি আসনে জয় পায়। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলটি পাঁচটি আসন পায় এবং হাসানুল হক ইনু মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পান। অর্থাৎ একসময় যে রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতার মৌলিক পরিবর্তনের দাবি নিয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিল, তার একটি ধারা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রক্ষমতার অংশীদার হয়।এই পরিবর্তনকে কেউ বাস্তববাদী জোটনীতি হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে, আবার কেউ প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনৈতিক দর্শন থেকে সরে যাওয়া হিসেবে দেখতে পারে। রাজনৈতিক ইতিহাসের বিচারে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই রূপান্তর জাসদের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যকে কতটা অক্ষুণ্ন রেখেছিল। কারণ একটি ছোট দলের জন্য বৃহত্তর জোটে থাকার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, জোটের বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে তার নিজস্ব আদর্শ ও কর্মসূচি ম্লান হয়ে যাওয়া।

জাসদের ২০১৬ সালের বিভক্তি এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। ছয় বছর পর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব নির্বাচন নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। একদিকে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে কমিটি ঘোষণা হয়, অন্যদিকে শরীফ নুরুল আম্বিয়া সভাপতি ও নাজমুল হক প্রধান সাধারণ সম্পাদক করে পৃথক কমিটি ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ একই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক দলের নামে দুটি সাংগঠনিক কাঠামো প্রকাশ্যে চলে আসে।এখানে শুধু ব্যক্তিগত নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। একটি রাজনৈতিক দলের কাউন্সিল, নেতৃত্ব নির্বাচন, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং ভিন্নমতের প্রতি আচরণ তার অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। যে দল সমাজে গণতন্ত্র, সাম্য ও শোষণমুক্তির কথা বলে, তার নিজস্ব সংগঠনেও সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন। জাসদের বারবার বিভক্তি তাই কেবল সাংগঠনিক দুর্বলতা নয়, দলীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিভক্তির পর প্রতিটি অংশই নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও আদর্শের দাবিদার থেকেছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, কোনটি মূল জাসদ, কোনটি প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শের ধারক এবং কোন রাজনৈতিক অবস্থানটি দলটির মূল দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান রাজনৈতিক দলসংক্রান্ত কাঠামোতেও জাসদের একাধিক পৃথক রাজনৈতিক পরিচয় দেখা যায়।

এই বহুদা বিভক্তি জাসদের রাজনৈতিক প্রভাবের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। একটি দলের শক্তি শুধু তার ঐতিহাসিক পরিচয়ে নয়; সংগঠনের বিস্তার, তৃণমূলের সক্রিয়তা, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নির্বাচনী সক্ষমতাও তার রাজনৈতিক গুরুত্ব নির্ধারণ করে। বারবার বিভক্তির ফলে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি কর্মীদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। একই নাম ও একই ইতিহাসের দাবিদার একাধিক অংশ থাকলে সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিকভাবে আগ্রহী নাগরিকের কাছেও দলের প্রকৃত অবস্থান বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।তবে জাসদের রাজনৈতিক ইতিহাসকে শুধু ভাঙনের ইতিহাস বললেও ন্যায্য হবে না। মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্রের বিভিন্ন পর্যায়ের সংগ্রাম এবং রাষ্ট্রীয় নীতির নানা বিষয়ে দলটির নেতাকর্মীদের ভূমিকা রয়েছে। প্রতিষ্ঠাকালীন অনেক নেতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আ স ম আবদুর রব মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সাবেক ডাকসু ভিপি পাশাপাশি স্বাধীনতার প্রথম পতাকা উত্তোলক হিসেবে জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলো। বর্তমানে তার নেতৃত্বাধীন জেএসডিও পৃথক রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে সক্রিয় রয়েছে। ২০২৬ সালে দলটি ১৭০টি আসনে প্রার্থী ঘোষণার কথাও জানিয়েছে।অর্থাৎ জাসদের বিভিন্ন ধারা এখনও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সক্রিয়তা কি প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শকে নতুন সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করতে পারছে? বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের পুরোনো ভাষ্যকে আজকের অর্থনৈতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, শ্রমিকের অধিকার, কৃষকের সংকট, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা হবে, সেই প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।

রাজনৈতিক দল শুধু অতীতের স্মৃতি দিয়ে টিকে থাকতে পারে না। নতুন প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক আদর্শের বাস্তব অর্থ কী, সেটি ব্যাখ্যা করতে হয়। আজকের তরুণ ভোটার স্বাধীনতার পরপরকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রত্যক্ষ অংশীদার নয়। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি, মূল্যস্ফীতি, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, দুর্নীতি, পরিবেশ এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা। ফলে সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিকে যদি নতুন প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক করতে হয়, তাহলে পুরোনো স্লোগানের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচি প্রয়োজন। next-2

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আরো পড়ুনঃ