হুজুগে বাঙালি, দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা— দেশকে রক্ষা করবে কে?
সানাউল হক নীরু: হুজুগে বাঙালি! এ দেশের অধিকাংশ মানুষ যেন স্রোতের বিপরীতে হাঁটার সাহস হারিয়ে ফেলেছে। সবাই স্রোতের সঙ্গে গা ভাসাতে চায়; কিন্তু সত্য, ন্যায় ও ন্যায়বিচারের পক্ষে নির্ভীকভাবে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা ক্রমেই কমে আসছে। অথচ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার ক্ষমতাবানদের দাপটে নয়, বরং সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সক্ষমতার মধ্যে নিহিত।
এ দেশের বর্তমান দুরবস্থার পেছনে সবচেয়ে বেশি দায়ী ক্ষমতাবান ব্যক্তি ও গোষ্ঠী, অবৈধ ও অসৎ উপায়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা সুবিধাভোগী শ্রেণি, ক্ষমতালোভী রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং দুর্নীতিতে জড়িত তথাকথিত শিক্ষিত লুটেরারা।
প্রতিটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী ও নিরঙ্কুশ করার স্বার্থে রাষ্ট্র ও জনগণের রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার পরিবর্তে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে তাদের ক্রমশ দুর্বল ও অকার্যকর করে তুলেছে। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে, জবাবদিহি সংকুচিত হয়েছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে ব্যক্তিগত ও দলীয় আনুগত্য প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার ওপর প্রাধান্য পেয়েছে।
রাজনৈতিক সরকারগুলোর অন্যতম বড় ব্যর্থতা হলো প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থে জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারা। বরং অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রভাবশালী আমলাতন্ত্রের মধ্যে এমন এক স্বার্থের সমঝোতা গড়ে উঠেছে, যেখানে জনগণের স্বার্থ গৌণ হয়ে পড়েছে, আর ক্ষমতা, অর্থ ও সুবিধা বণ্টনের হিসাব মুখ্য হয়ে উঠেছে।
এই সুযোগে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য কর্মকর্তা, অসাধু ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক সুবিধাভোগী এবং বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছে। ফলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার পরিবর্তিত হলেও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা সুবিধাভোগী চক্রের প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই অটুট থেকে গেছে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে তাদের প্রভাব দেশের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
সরকার আসে, সরকার যায়—কিন্তু দুর্নীতিবাজ ও রাষ্ট্রের সম্পদ লুণ্ঠনকারীদের অনেকেরই বিচার হয় না। তারা যেন আইনের ঊর্ধ্বে এক বিশেষ শ্রেণি! রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশাসনিক প্রভাব, অর্থের শক্তি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তাদের অপরাধ করার সাহস জোগায়। যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে, তার সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরকারি সম্পদ লুণ্ঠন, দুর্নীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। আবার অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের পথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এই ব্যবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্রের একাংশ, অসাধু ব্যবসায়ী, ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের অর্থ লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, ভূমিদস্যু, ঘুষ-দুর্নীতির কারবারি এবং বদলি ও তদবির-বাণিজ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সুবিধাভোগীরা পরস্পরের স্বার্থ রক্ষার সুযোগ পেয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ ও ক্ষমতা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ উঠলেও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়নি বহু ক্ষেত্রে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, আইন ও নীতিমালার প্রয়োগ যদি অপরাধ দমন করার পরিবর্তে প্রভাবশালী অপরাধীদের সুরক্ষা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। ব্যাংক, শেয়ারবাজার, ভূমি প্রশাসন, পুলিশ, বিচার বিভাগ কিংবা সরকারি দপ্তর—কোনো ক্ষেত্রেই অনিয়মের অভিযোগকে রাজনৈতিক পরিচয় বা ক্ষমতার বিবেচনায় বিচার করা চলতে পারে না।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন কিংবা বিচার বিভাগের কোনো অংশ যখন রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে আসে। তবে মনে রাখতে হবে, সব কর্মকর্তা, বিচারক কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দুর্নীতিগ্রস্ত নন। বরং সৎ ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করাই রাষ্ট্র সংস্কারের অন্যতম প্রধান শর্ত।
এ দেশের কিছু ক্ষমতাবান দুর্নীতিবাজের অবস্থা দেখে মনে হয়, তাদের যেন দেবী দুর্গার মতো দশ হাত! এক হাতে ক্ষমতা, অন্য হাতে অর্থ, আরেক হাতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা—সব মিলিয়ে অন্যায় করেও তারা বারবার পার পেয়ে যায়। বিপরীতে সাধারণ মানুষকে মূল্য দিতে হয় দুর্নীতি, বৈষম্য, অর্থনৈতিক সংকট, বিচারহীনতা ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মাশুল দিয়ে। জনগণ স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও যদি ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতার সুফল কোথায়?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এই অচলাবস্থা থেকে রক্ষা করতে হলে কেবল সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, রাষ্ট্র কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; আমলাতন্ত্র কোনো রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ বাহিনী নয়; পুলিশ কোনো দলের লাঠিয়াল বাহিনী নয়; আর বিচার বিভাগ ক্ষমতাবানদের অপরাধ আড়াল করার আশ্রয়স্থল হতে পারে না।
প্রয়োজন স্বাধীন ও কার্যকর দুর্নীতি দমন ব্যবস্থা, প্রশাসনের পেশাগত নিরপেক্ষতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, পুলিশের জবাবদিহি, ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের লুটপাটের নিরপেক্ষ তদন্ত, অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক পরিচয়নির্বিশেষে অপরাধীদের ন্যায়সংগত বিচার। পাশাপাশি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে এমনভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো সরকারই ক্ষমতার অপব্যবহার করে জনগণের অধিকার হরণ করতে না পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, জনগণকেও হুজুগ, অন্ধ দলীয় আনুগত্য এবং ব্যক্তিপূজার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যে অন্যায় নিজের দলের লোক করে, তার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করতে হবে। কারণ অন্যায়কারী যে দলেরই হোক, তার অপরাধকে সমর্থন করার অর্থ নিজের ভবিষ্যৎকেই বিপন্ন করা।