মতানৈক্য থাকলেও সংঘাত নয়: বদলানোর চেষ্টা হচ্ছে ভারত-চীন সম্পর্কের সমীকরণ

মেজর (অব.) মনজুর কাদের: নয়াদিল্লিতে ১২–১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬-এ অনুষ্ঠিত BRICS শীর্ষ সম্মেলন শুধু একটি বহুপাক্ষিক বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর আড়ালে ভারত ও চীনের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়েরও ইঙ্গিত মিলেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই নেতা এমন একটি বার্তা দিয়েছেন—মতানৈক্য থাকতেই পারে, কিন্তু সেই মতানৈক্য যেন সংঘাতে রূপ না নেয়।

ভারতীয় গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে এই বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিক উন্মোচনের সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ২০২০ সালের ১৫ জুন গালওয়ানে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ডোকলামে দু’দেশের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে দোলাচল, অরুণাচল নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে চিনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গালওয়ান সংঘাতের পর এই প্রথম শি জিনপিং ভারত সফর করলেন। ফলে দিল্লির BRICS সম্মেলনে মোদি-শি বৈঠকের দিকে শুধু ভারত ও চীন নয়, গোটা বিশ্বের নজর ছিল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিং ও নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল করার জন্য যেভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছে, তাতে এই বৈঠকের তাৎপর্য আরও বেড়েছে।
BRICS-এর নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রেও বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে। কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে ঘোষণাপত্রে একতরফা শুল্ক ও অশুল্ক বাণিজ্যিক ব্যবস্থার সমালোচনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যব্যবস্থার গতিপথ বদলে দিতে পারে।
নিষেধাজ্ঞারও বিরোধিতা
বৈঠকে একই সঙ্গে একতরফা নিষেধাজ্ঞারও বিরোধিতা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির বিরুদ্ধে BRICS-এর সম্মিলিত আপত্তির একটি কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট হয়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, গাজা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়েও ঘোষণাপত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংলাপ, পরামর্শ ও কূটনীতির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেন প্রশ্নে নিশ্চুপ: পহেলগাঁও নিয়ে আলোচনা
ইউক্রেন প্রশ্নে অবশ্য ঘোষণাপত্রের ভাষা তুলনামূলকভাবে সতর্ক—এটি BRICS-এর অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যকেও প্রকাশ করে। ভারতের জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো পহেলগাঁও সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা। ঘোষণাপত্রে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিলের হামলায় নিহত ২৬ জনের প্রসঙ্গ তুলে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা বলা হয়েছে। তবে কোনো দেশকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ভারত ও চীন—দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি—একটি বৃহত্তর বাস্তবতাকে স্বীকার করার দিকে এগোচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে: প্রতিযোগিতা থাকবে, সীমান্ত নিয়ে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু সংঘাত কোনো পক্ষেরই স্বার্থে নয়।
এখানেই রয়েছে BRICS-এর বর্তমান ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব। সংগঠনটি শুধু অর্থনৈতিক জোট নয়; ক্রমেই এটি এমন একটি মঞ্চে পরিণত হচ্ছে, যেখানে চীন, ভারত, রাশিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন শক্তি পশ্চিমা-নির্ভর একক বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তে একটি বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থা গড়ার প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।
BRICS-এর অভ্যন্তরে মতপার্থক্য প্রবল হলেও, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় উন্নয়নশীল বিশ্বের ভূমিকা বাড়ানো এবং একতরফা অর্থনৈতিক চাপের বিরোধিতার প্রশ্নে একটি অভিন্ন অবস্থান ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে।
মোদি-শি বৈঠকের তাৎপর্য শুধু ভারত-চীন সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি এশিয়ার দুই বৃহৎ শক্তির মধ্যে সংঘাত থেকে ব্যবস্থাপিত প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সহযোগিতা এবং একক আধিপত্য থেকে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার দিকে সম্ভাব্য পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত–যা নতুন স্নায়ু যুদ্ধের সময় এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
চীন পূর্বে‌ই সতর্কপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে
২০১৮ সালে (বানিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে) চীন বিশেষভাবে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বৃহত্তর ঐক্য, সংযোগ ও সহযোগিতার ধারণা যখন সামনে এনেছিল, তখন ভারত এক‌ই সাথে যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চীনকে এড়িয়ে চলতে গিয়ে বিপাকে পড়ে।
চানক্য নীতি যে স্নায়ু যুদ্ধের সময় কার্যকর হয়না তা নরেন্দ্র মোদী সঠিকভাবে বুঝতে পারেননি। চীন ঠিকই বুঝতে পেরেছিল যে প্রথম স্নায়ু যুদ্ধের সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ভারত রাশিয়াকে ছাড়া চলতে পারবে না। তাই চীন রাশিয়ার সঙ্গে গড়ে তুলেছে গভীর সম্পর্ক। গালওয়ান সংঘাতের সময়ে রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ভারতের মুখ রক্ষা হয়।
নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
২০১৮ সালে পুরোনো স্নায়ুযুদ্ধের স্মৃতি পেছনে ফেলে বিশ্ব যখন নতুন এক ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন চীন এশিয়াকে তার কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন চীনের উত্থান ঠেকাতে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত চাপ বাড়াতে শুরু করে, তখন চীন এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বিভাজনের পরিবর্তে সহযোগিতা ও পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়।
এশিয়ার নিজস্ব শক্তি ও সংহতি
শি জিনপিংয়ের “অভিন্ন ভবিষ্যতের সম্প্রদায়” ধারণার মাধ্যমে চীন এশীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সহযোগিতাকে আরও ঘনিষ্ঠ করার আহ্বান জানায়। ফলে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, চীন–আসিয়ান সহযোগিতা এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো কাঠামো শুধু অর্থনৈতিক প্রকল্প বা আঞ্চলিক সংগঠন হিসেবে নয়, বরং উদীয়মান বহুমুখী বিশ্বব্যবস্থায় এশিয়ার নিজস্ব শক্তি ও সংহতি গড়ে তোলার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন নতুন স্নায়ুযুদ্ধে তার নিজস্ব বলয়কে সংগঠিত করে শক্তি প্রদর্শন করতে শুরু করে, চীন তখন এশিয়ার অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে ঐক্যের হাতিয়ারে পরিণত করতে চেয়েছে।
প্রতিক্রিয়া
ব্রিক্সের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবেলা করার জন্য রাশিয়া যদি ভারতকে চীনের পাশে ভিড়িয়ে দিতে চায় তাহলে যুক্তরাষ্ট্র কালক্ষেপণ না করে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান এবং বাংলাদেশকে নিজের বলয়ে রাখার জন্য পদক্ষেপ নেবে, যেমনটি বিগত স্নায়ু যুদ্ধের সময় করেছিল– ভারত এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধিতা করতে হয়েছিল।
বর্তমান স্নায়ু যুদ্ধের সময় পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্বের কারণে ছোট দেশগুলোর অবস্থান আগামী দিনগুলোতে আরো স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
লেখকঃ সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য
আরো পড়ুনঃ