৩৫ উড়োজাহাজের ঋণ: দায় কার? বিমান নাকি রাষ্ট্রের?

শেখনিউজ রিপোর্টঃ চুক্তি হয়েছে ৩৫টি উড়োজাহাজের। কিন্তু এগুলোর জন্য কত ঋণ নিতে হবে, বছরে কত কিস্তি দিতে হবে এবং সেই অর্থ বিমান কোথা থেকে আয় করবে—এসব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর এখনো প্রকাশ্যে নেই। বহর সম্প্রসারণের ঘোষণার আড়ালে তাই বড় প্রশ্ন: বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস কি নতুন ঋণ নিজে শোধ করতে পারবে, নাকি সরকারি গ্যারান্টির কারণে দায় শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকে বহন করতে হবে?

বোয়িংয়ের কাছ থেকে দুই দফায় ২৫টি এবং এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজের ক্রয়াদেশ নিশ্চিত হয়েছে। প্রথম বোয়িং চুক্তি হয় ৩০ এপ্রিল, দ্বিতীয় ক্রয়াদেশ ঘোষণা করা হয় ২৩ সেপ্টেম্বর এবং এয়ারবাস চুক্তি হয় ৭ অক্টোবর।

ঋণ পাওয়ার সুযোগ আছে; শোধের হিসাব কোথায়?

প্রথম ১৪টি বোয়িংয়ের চুক্তির সময় বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, যুক্তরাষ্ট্রের Export-Import Bank বা EXIM Bank ঋণের ব্যবস্থা করবে এবং বাংলাদেশ সরকার সার্বভৌম গ্যারান্টি দেবে। মার্কিন রাষ্ট্রদূতও EXIM Bank-এর অর্থায়নের কথা উল্লেখ করেন। তবে নির্দিষ্ট ঋণের পরিমাণ, সুদের হার ও পূর্ণ কিস্তির সূচি প্রকাশিত বক্তব্যে দেওয়া হয়নি।

EXIM Bank সরাসরি ঋণ দিতে পারে, অথবা অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ঋণের গ্যারান্টি দিতে পারে। সংস্থাটির সাধারণ উড়োজাহাজ অর্থায়ন ব্যবস্থায় শর্তসাপেক্ষে নিট মার্কিন চুক্তিমূল্যের সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থায়ন এবং সর্বোচ্চ ১২ বছরের পরিশোধ মেয়াদের সুযোগ রয়েছে। ঋণ অনুমোদনে বিমান সংস্থা বা গ্যারান্টিদাতার আর্থিক সক্ষমতা, জামানত ও ঝুঁকি বিবেচনা করা হয়।

অর্থাৎ এই কাঠামোয় অর্থায়ন হলে ক্রয়মূল্যের অবশিষ্ট অংশও জোগাড় করতে হবে। কিন্তু বিমানের জন্য কত শতাংশ অর্থায়ন অনুমোদিত হয়েছে, নিজস্ব অর্থ কত লাগবে এবং ঋণের মেয়াদ কত হবে—সেই চূড়ান্ত নথি এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। অতিরিক্ত ১১টি বোয়িংয়ের জন্য একই ঋণব্যবস্থা প্রযোজ্য হবে কি না, সেটিও প্রকাশ্যে নিশ্চিত নয়।

এয়ারবাসের ঋণেও অসম্পূর্ণ তথ্য

এয়ারবাস চুক্তির অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ হাইকমিশনার জানান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির রপ্তানি ঋণ সংস্থাগুলো চুক্তিকে সমর্থন দিয়েছে। বাংলাদেশে যুক্তরাজ্যের পণ্য ও সেবা কেনার জন্য UK Export Finance-এর মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২ বিলিয়ন পাউন্ড সহায়তার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তবে পুরো অঙ্কটি বিমানের এয়ারবাস ক্রয়ের জন্য অনুমোদিত ঋণ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।

চুক্তির আগে এয়ারবাস ক্রয়ব্যয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ ইউরোপীয় অর্থায়নে বহনের সম্ভাবনার কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছিল। চূড়ান্ত ঋণদাতা, সুদ, মেয়াদ ও গ্যারান্টির পূর্ণ বিবরণ এই অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। ফলে অর্থায়নের সমর্থন পাওয়া এবং নির্দিষ্ট শর্তে ঋণ চূড়ান্ত হওয়ার বিষয় দুটি আলাদা করে দেখতে হবে।

প্রকৃত মূল্য না জানলে দায়ও জানা যায় না

প্রথম ১৪টি বোয়িংয়ের জন্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের অঙ্ক প্রকাশিত হয়েছে। তবে চুক্তির সময় রয়টার্স জানিয়েছিল, কর্মকর্তারা প্রকৃত মূল্য প্রকাশ করেননি; অঙ্কটি ছিল তালিকামূল্যের হিসাব। অতিরিক্ত ১১টি বোয়িংয়ের ব্যয় প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার হবে বলে পরে জানিয়েছেন বিমানমন্ত্রী। এয়ারবাসের ১০টির প্রকৃত চুক্তিমূল্যও প্রকাশ করা হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে ৩৫টি উড়োজাহাজের নিশ্চিত মোট মূল্য কিংবা সুদসহ মোট দায় নির্ধারণ করা যাচ্ছে না। ক্রয়মূল্যের সঙ্গে ঋণের ফি, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণে কী কী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তার ওপরও বিনিয়োগের পূর্ণ ব্যয় নির্ভর করবে।

মুনাফা আছে, কিন্তু কিস্তির টাকা কি থাকবে?

বিমানের প্রকাশিত হিসাবে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে নিট মুনাফা ছিল ৭৮৫ দশমিক ২১ কোটি টাকা, পরিচালন মুনাফা ১ হাজার ৬০২ কোটি টাকা এবং আয় ১১ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি তখন টানা পঞ্চম বছরের মুনাফার কথা জানিয়েছে। তাই বিমানকে বর্তমানে ক্রমাগত লোকসানি বলা এই হিসাবের সঙ্গে মেলে না।

কিন্তু মুনাফার ঘোষণা নতুন ঋণ শোধের নিশ্চয়তা নয়। টিকিট, কার্গো ও অন্যান্য আয় থেকে জ্বালানি, বেতন, রক্ষণাবেক্ষণ, বিমানবন্দর চার্জ, পুরোনো ঋণ এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ মেটানোর পর কত নগদ অর্থ থাকবে—কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা বিচার করতে হবে সেই হিসাব দিয়ে।

পুরোনো বকেয়ার দাবিও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের আগস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পদ্মা অয়েল প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ প্রায় ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা পাওনার দাবি করে। বিমান জানিয়েছিল, দাবিকৃত অঙ্ক তাদের হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না এবং কিছু দাবি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। নতুন দায় নেওয়ার সক্ষমতা বুঝতে এসব দাবির হালনাগাদ অবস্থা ও নিষ্পত্তির হিসাব প্রয়োজন।

কীভাবে শোধ হবে ঋণ?

বিমানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিমান নিজস্ব আয় ও অর্থায়নের মাধ্যমে ক্রয়ব্যয় মেটাবে। উড়োজাহাজ ধাপে সরবরাহ হবে বলে অর্থও ধাপে পরিশোধ করা হবে। প্রথম ১৪টি বোয়িংয়ের সরবরাহ নভেম্বর ২০৩১ থেকে অক্টোবর ২০৩৫ পর্যন্ত নির্ধারিত বলে প্রকাশিত হয়েছে।

এতে তাৎক্ষণিক অর্থের চাপ ভাগ করা সম্ভব হতে পারে। তবে ধাপে পরিশোধ মানে দায় কমে যাওয়া নয়। EXIM Bank-এর সাধারণ নিয়মে ঋণ ত্রৈমাসিক অথবা বিশেষ ক্ষেত্রে অর্ধবার্ষিক কিস্তিতে পরিশোধ করতে হয়। বিমানের প্রকৃত কিস্তি ও পরিশোধ শুরুর সময় নির্দিষ্ট ঋণচুক্তির ওপর নির্ভর করবে।

বিমানের সক্ষমতা পরীক্ষার জন্য তাই প্রয়োজন বছরভিত্তিক একটি হিসাব: নতুন উড়োজাহাজ কোন রুটে চলবে, কত আয় করবে, পরিচালনায় কত খরচ হবে এবং সব দায় মেটানোর পর কিস্তির জন্য কত অর্থ থাকবে। প্রত্যাশার চেয়ে যাত্রী কম হলে, জ্বালানির দাম বাড়লে কিংবা টাকার মান কমলে সেই হিসাব কতটা বদলাবে, সেটিও দেখাতে হবে।

রিজার্ভ আছে মানেই বিমানের টাকা আছে নয়

৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক-উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৬ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার; BPM6 হিসাবে প্রায় ৩১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। এই রিজার্ভ বিমানের নিজস্ব তহবিল নয়। আন্তর্জাতিক লেনদেনের ঘাটতি মোকাবিলা ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতি রক্ষাসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজে এটি ব্যবহৃত হয়।

তাই দেশের রিজার্ভের অঙ্ক দেখিয়ে বিমানের ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য নিশ্চিত করা যায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব ব্যবসা থেকে পর্যাপ্ত অর্থ আয় করতে পারবে কি না।

বিমান ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের দায়

প্রথম বোয়িং ক্রয়ের জন্য ঘোষিত সার্বভৌম গ্যারান্টি কার্যকর থাকলে বিমান ঋণ শোধে ব্যর্থ হওয়ার ক্ষেত্রে গ্যারান্টির শর্ত অনুযায়ী সরকারের ওপর দায় আসতে পারে। ফলে ঋণ বিমানের নামে নেওয়া হলেও ঝুঁকির একটি অংশ রাষ্ট্র বহন করবে।

প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, ঋণ ও সরকারি গ্যারান্টির মাধ্যমে উড়োজাহাজ কেনার ব্যবস্থা করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু ৩৫টি উড়োজাহাজের ঋণ বিমান নিজস্ব আয় থেকে নিয়মিত শোধ করতে পারবে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য তথ্য যথেষ্ট নয়।

এই ক্রয়ের আর্থিক যুক্তি প্রতিষ্ঠা করতে বিমানকে প্রকৃত চুক্তিমূল্য, অনুমোদিত ঋণ, সুদ, কিস্তি এবং ভবিষ্যৎ নগদ প্রবাহের হিসাব প্রকাশ করতে হবে। পাঠকের জানার বিষয় শুধু কতটি উড়োজাহাজ আসবে তা নয়; সেগুলোর দেনা শোধ করতে বিমান কত আয় করবে এবং আয় কম হলে দায় কে নেবে।

আরো পড়ুনঃ