শেখনিউজ ডটকম

ইইউ থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছে তুরস্ক

শেখনিউজ ডটকম: সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, এলজিবিটিকিউআই+ জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং স্থানীয় গণতন্ত্রকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ তুরস্ককে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ অর্জনের লক্ষ্য থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ইইউ-এর সম্প্রসারণ বিষয়ক কমিশনার মার্টা কস।

তুরস্ক ১৯৯৯ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের আনুষ্ঠানিক প্রার্থী। তবে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ড নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণে দেশটির সদস্যপদ আলোচনা কার্যত স্থবির রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের একটি আদালত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম টি২৪ (T24)-এর ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। তুর্কি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, গত এক বছরে সংবাদমাধ্যমটি ১১৮টি এমন বিষয়বস্তু প্রকাশ করেছে, যেগুলোকে তারা ‘এলজিবিটি প্রচারণা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

‘মাই ফ্যামিলি ইজ সেফ’ বা ‘আমার পরিবার নিরাপদ’ নামে পরিচালিত একটি তদন্তের অংশ হিসেবে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তুর্কি সরকারের বক্তব্য, শিশু ও পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে এলজিবিটিকিউ+ অধিকার সংগঠন, মানবাধিকারকর্মী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন এসব পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে।

তুরস্কের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এদিরনে প্রদেশে ইইউ অর্থায়নে নির্মিত একটি রেলওয়ে প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মার্টা কস।

তিনি বলেন, ইউরোপের পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতায় তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতামূলক এবং উভয় পক্ষের জন্য লাভজনক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জোরালো আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে উদ্বেগও বাড়ছে।

কস বলেন, “সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, এলজিবিটিকিউআই+ জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং স্থানীয় গণতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলা সাম্প্রতিক ঘটনাবলি তুরস্কের ইইউ সদস্যপদের লক্ষ্যের সঙ্গে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”

তিনি জানান, আগামী ২৮ অক্টোবর প্রকাশিতব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বার্ষিক সম্প্রসারণ প্রতিবেদনে এসব বিষয়ে ইইউ-এর গভীর উদ্বেগ তুলে ধরা হবে।

কসের ভাষায়, “বাস্তব পরিস্থিতি প্রকাশ্যে ও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে আমি পিছপা হব না।”

তার মন্তব্যের পর তুরস্ক সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

তুরস্ককে এখন আরও বেশি প্রয়োজন ইউরোপের

তুরস্কের ইইউ সদস্যপদ আলোচনা স্থবির থাকলেও আঙ্কারা ও ব্রাসেলসের মধ্যে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিদ্যমান কাস্টমস ইউনিয়ন বা শুল্কব্যবস্থা হালনাগাদের দাবি জানিয়ে আসছে। পাশাপাশি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আগ্রহও প্রকাশ করেছে আঙ্কারা।

এর মধ্যে রয়েছে সিকিউরিটি অ্যাকশন ফর ইউরোপ বা SAFE, যার মাধ্যমে ইউরোপে প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; সিঙ্গেল ইউরো পেমেন্টস এরিয়া বা SEPA, যা ইউরো মুদ্রায় আন্তঃদেশীয় নগদবিহীন লেনদেন সহজ করে; এবং ইউরোপে উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রস্তাবিত ‘মেড ইন ইউরোপ’ নীতি।

মার্টা কস বলেন, ইউরোপ ও এর আশপাশে চলমান সংঘাত এবং বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায় তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে।

তিনি বলেন, “চার-পাঁচ বছর আগের তুলনায় বর্তমানে তুরস্কের গুরুত্ব অনেক বেশি।”

কসের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে তুরস্কের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতার দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নিয়ে কাজ চলছে।

প্রথমটি হচ্ছে কাস্টমস ইউনিয়নের লক্ষ্যভিত্তিক হালনাগাদ। এ ক্ষেত্রে তুরস্ককে তার কিছু আইন ও বিধান ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে সরকারি কেনাকাটা বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট। ইউরোপের ‘মেড ইন ইউরোপ’ কাঠামোর সঙ্গে তুরস্ক যুক্ত হতে চাইলে এ ক্ষেত্রে আঙ্কারার নীতিগত ও আইনি সামঞ্জস্য গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে মনে করেন ইইউ কমিশনার।

একদিকে মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র নিয়ে ব্রাসেলসের উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে ইউরোপের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থে তুরস্কের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে। ফলে আঙ্কারা ও ব্রাসেলসের সম্পর্ক এখন সদস্যপদ প্রশ্নের পাশাপাশি বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার হিসাবেও নতুনভাবে বিবেচিত হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্সের প্রতিবেদন অবলম্বনে শেখনিউজ ডটকম

Exit mobile version