শেখনিউজ ডটকম

হুমকী-হুঁশিয়ারি!

সাঈদ তারেকঃ হুমকী বলেন আর হুঁশিয়ারি, জেনারেল ওয়াকার কিছু কঠিন সত্য উচ্চারণ করেছেন। কথাগুলো আরও আগেই বলা উচিত ছিল। আমাদের দেশের রাজনীতিকদের তো আর জীবনেও শিক্ষা হবে না, আর্মির হান্টার যদি কিছুটা সিধা রাখতে পারে! ওয়ান ইলেভেনের সময় এত প্যাদানী খেলো! পাশাপাশি সাবজেলে দুই নেত্রীর কি গলায় গলায় পিড়িত! এক নেত্রী নিজ হাতে রেঁধে আর এক নেত্রীকে খাওয়ান। যেই ওয়ান ইলেভেন গেল, অমনি যা- তাই! দা আর কুমড়োয় শুরু হয়ে গেল কিলাকিলি চুলাচুলি।
সেদিন জেনারেল ওয়াকার যা বলেছেন তা শুধু তার নিজের না, গোটা আর্মির বক্তব্য। প্রফেসর ইউনুস বয়োবৃদ্ধ মানুষ। তার ওপর ভীষণ নরম প্রকৃতির। এই দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁর কাঁধে বন্দুক রেখে যে যার মত শিকারে নেমেছে। কেউ চায় ইসলামি শাষন কারও স্বপ্ন তালিবানি শাষন। একদল বলছে সংষ্কার না করে নির্বাচন না, আর এক দলের দাবী সংষ্কার আমরা দেখবো আগে নির্বাচন দাও। কেউ চাইছে আগে স্থানীয় সংস্থার নির্বাচন। ছাত্ররা দল গোছাতে মরীয়া। যেন ট্রেন ছুটে যাচ্ছে, এইবারই ধরতে হবে! কমিটি ঘোষনা করতে গিয়ে নিজেরা নিজেরা কিলাকিলিতে লিপ্ত হচ্ছে। কোথাও কোথাও নিজেরাই অবাঞ্ছিত হয়ে যাচ্ছে।
রাস্তায় নানামুখী আন্দোলনের ঢেউ। আইনশৃংখলা পরিস্থিতি বলতে কিছু নাই। চোর ডাকাত ছিনতাইকারি চাঁদাবাজ তোলাবাজদের ফ্রিস্টাইল দৌড়াত্ব। র‌্যাব পুলিশ নিষ্ক্রিয়। এর মধ্যে কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন ইউটিউবারের উষ্কানীতে সামাজিক বিশৃংখলা বাড়ছে। মব ট্রায়াল সামাজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃস্টি করছে। অবস্থা এমনই লেজেগোবরে- সামান্য এক প্রেস সেক্রেটারিকে প্রায়ই সরকারের নীতিনির্দ্ধারণী বক্তব্য নিয়ে ক্যামেরার সামনে আসতে হচ্ছে!
মানুষ এখন প্রকাশ্যেই বলছে এই সমস্ত কিলাকিলি গুতাগুতির জন্য কি স্বৈরাচার উৎখাত করা হয়েছে! ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করেছিল কোটা সংষ্কারের দাবীতে। ওবায়দুল কাদেরের ইয়ার্কী-ফাতরামি সরকারের ওভার কনফিডেন্স সর্বোপরি শেখ হাসিনার হুকরামির কারনে পরিস্থিতির অবনতি হয়। গনহত্যায় জাতিসংঘের যান ব্যবহার করায় যখন মহাসচিব শান্তিরক্ষা মিশন থেকে খারিজ করে দেবার হুমকী দেন তারপর থেকেই পরিস্থিতি দ্রত বদলাতে থাকে। পীসকিপিং মিশন হারানোর ভয় বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের স্যাংশন খাওয়ার ভয়, অথবা মানবিক কারন- যে কারনেই হোক আর্মি সেদিন গুলী করে আরও মানুষ হত্যা করতে শেখ হাসিনার নির্দেশ অমান্য না করলে স্বৈরাচার উৎখাত হয় না।
শেখ হাসিনা সেদিন বলেছিলেন পাঁচ দশ হাজার- যত পারো মানুষ খুন করো, তারপরও আমার গদী রক্ষা করো। পীস কিপিং স্যাংশন সামাল দেওয়ার জন্য ভারত আছে। তারা সব ঠিক করে দেবে, যেমনটা দিয়েছে চব্বিশের ‘আমি আর ডামি’র নির্বাচনের পর। আর্মি সেদিন শেখ হাসিনার কথা শোনে নাই।
তৃতীয় বিশ্বের যে কোন দেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শেষ কার্ডটা খেলে আর্মি। বাংলাদেশে গত জুলাই-আগস্ট আন্দোলনেও তার ব্যত্যয় হয় নাই। ছাত্র জনতা রাস্তায় থেকেছে গুলী খেয়েছে প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু শেখ হাসিনা পালিয়েছে আর্মি তার কথা না শোনায়। আর আর্মিকে এই মিশনে নেতৃত্ব দিয়েছে জেনারেল ওয়াকার। শুধু তাই না, এরপর থেকে অভ্যন্তরীন যতরকম সংকট বাইরে থেকে হুমকী, সব সামাল দিচ্ছেন তিনি। তিনিই ভাল জানেন আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকী কোথা থেকে এবং কিভাবে আসছে। কাজেই তিনি যখন বলেন সবাই কিলাকিলি গুতাগুতি বন্ধ করে সকল জাতীয় বিষয়ে একমত হতে না পারলে আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব হুমকীর মুখে পড়বে’ বুঝতে হবে এর কিছু সারবত্তা আছে। শ্রেফ বাত কা বাত না। তিনি এটা মীন করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা এই সরকারের ক্ষমতার ভিত্তিই হচ্ছে আর্মি। আর্মি বললে সরকার আছে, না বললে নাই। এটাই বটম লাইন। কয়েকজনকে বলতে শুনলাম উনার ভাষা এমন বডি ল্যাংগুয়েজ তেমন। আরে ভাই উনার বডি ল্যাংগুয়েজ থাকবে না তো ছলিমুদ্দিন কলিমুদ্দিনের থাকবে!
কোটা সংষ্কার আন্দোলন ঘটনাচক্রে এক দফায় গড়িয়েছে। আন্দোলন যখন শুরু হয় কেউ ভাবে নাই তা শেখ হাসিনার পতনের দাবীতে গিয়ে ঠেকবে। তিনদিনের নোটিশে যখন শেখ হাসিনা পালালেন তখনও কারও মাথায় নাই সংষ্কার করে রাষ্ট্রের খোলনৈচা পাল্টাতে হবে। গদীতে বসে রব উঠলো এই করতে হবে ওই করতে হবে, সংষ্কার করতে তিন বছর পাঁচ বছর লাগবে। সংষ্কারের পরেই নির্বাচন। ভাল কথা। সংষ্কার আমাদের দরকার। রাজনৈতিক সামাজিক অর্থনৈতিক সাংষ্কৃতিক, সমাজের প্রতিটি স্তরের ঘুণ ধরে আছে। এর আমূল পরিবর্তন অবশ্যই দরকার।
কিন্তু পরিবর্তনটা আনবে কে! দেখা গেল সংবিধান মেনে একটা সর্বতো অসাংবিধানিক সরকার! তাতে বসে আছে কতগুলো এনজিও প্রতিনিধি আর রিটায়ার্ড বুড়ো হাবড়া। সাথে কয়েকজন তরুন যাদের শরীরে ছাত্রত্বের গন্ধ। আর এই সরকার দাঁড়িয়ে আছে পতিত স্বৈরাচারের রেখে যাওয়া প্রশাসনযন্ত্রের ওপর! তখনই বোঝা গেছিলো এরা কতদুর যেতে পারবে। দিন যায় আর ক্ষমতায় টিকে থাকার লোভ জেঁকে বসে। চোখ বুজলে যখনই দেখে একদিন এই রাজসিক জীবনের অবসান ঘটবে চোখ খুলে তখনই সংষ্কার সংষ্কার রবে চেঁচিয়ে ওঠে! গত সাত মাসে সংষ্কার নিয়ে এইসব কেরিকেচার দেশবাসী দেখেছে। জেনারেল ওয়াকারও দেখেছেন। কমিশনের পর কমিশন হয়েছে। দিস্তাকে দিস্তা সুপারিশনামা। কারও পড়ে দেখারও সময় নাই। শুধু সংষ্কার সংষ্কাররবে চীৎকার চেঁচামেচি। মানুষ ত্যাক্তবিরক্ত। এই প্রেক্ষিতে জেনারেল ওয়াকার যদি বলেন, এনাফ। যথেষ্ঠ হয়েছে। যথার্থই বলেছেন। আপামর দেশবাসীর মনের কথারই প্রতিধ্বনী করেছেন তিনি।
বলেছেন ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের কথা। দেখলাম কাজ হয়েছে। প্রফেসর ইউনুসও কাল বলেছেন ডিসেম্বরেই নির্বাচন। এক নির্বাচন কমিশনারও বলেছেন ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন করার লক্ষ্যেই তারা কাজ করছেন। জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্য কোন নিবাচন অনুষ্ঠানের চিন্তা তাদের মাথায় নাই।
২৫ তারিখের পর থেকে রাজনৈতিক মহলে রা রব একটু কম। নতুন দল গঠনে শুধু ছাত্রদের অস্থিরতা। অবশ্য ধান্ধাবাজ বিশেষ করে যারা চেয়েছিলেন ওয়াকারউজ্জামান-প্রফেসর ইউনুসের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে, এই শ্রেণীর কিছু লোককে দেখলাম বিষোদ্গার করতে। দেশের বাইরে থেকে কিছু দায়িত্বজ্ঞানহীন উষ্কানীদাতা ইউটিউবারকেও দেখা যাচ্ছে জেনারেল ওয়াকারের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করতে। অবশ্য এসবে কিছু যায় আসে না।
আশা করি জেনারেল ওয়াকারের কথার গুরুত্ব বুঝে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আর ল্যাং মারামারি খেলায় মত্ত হবে না। ডিসেম্বরের মধ্যে এরা যতটা সংষ্কার পারে করে দিক। বাকিটা পরের সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বসে করবে। দলগুলোর উচিত হবে টাকা খেয়ে চোরচোট্টা টাউট বাটপারদেরকে নমিনেশন না দিয়ে কিছু শিক্ষিত সজ্জন ভাল লোককে সংসদে আনতে। যাতে সংসদটা পবিত্র হয়। জনগনের কিছু কাজ হয়।
Exit mobile version