শেখনিউজ ডটকম

প্রেক্ষাপট হালের জাসদ: বহুদা বিভক্তি ও আদর্শচ্যুতি (২)

ফিরোজ আলম মিলন: ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জাসদের সামনে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। হাসানুল হক ইনু, যিনি জাসদের একটি প্রধান ধারার সভাপতি ছিলো এবং দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে রাজনীতি করেছে, ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট গ্রেপ্তার হয়। পরবর্তীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৬ সালের ৩০ জুন তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ উভয়েই আপিলের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।

এই ঘটনাকে ঘিরে জাসদের রাজনৈতিক অবস্থানও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দলটির কর্মী-সমর্থকদের পক্ষ থেকে রায়ের প্রতিবাদ ও ইনুর মুক্তির দাবিতে দেশ-বিদেশে কর্মসূচি হয়েছে। একই সময়ে আদালতের রায়ে ইনুর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ও দায়ের বিষয়টি উঠে এসেছে। এখানে অবশ্য একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: একজন নেতার বিরুদ্ধে আদালতের রায় এবং পুরো একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শ এক জিনিস নয়। কিন্তু কোনো দলের প্রধান নেতার বিরুদ্ধে এমন বিচারিক সিদ্ধান্ত সেই দলের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি, নেতৃত্বের প্রশ্ন এবং অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করে।

অন্যদিকে জেএসডির রাজনীতিতে আ স ম আবদুর রবের নেতৃত্বে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান দেখা গেছে। গণতান্ত্রিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, সুশাসন এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রশ্নে তিনি বিভিন্ন সময়ে বক্তব্য দিয়েছেন। ২০২৬ সালেও জেএসডি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় রয়েছে।ফলে আজকের জাসদকে একক রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে মূল্যায়ন করাও কঠিন। বরং বলা যায়, ১৯৭২ সালের একটি রাজনৈতিক আন্দোলন দীর্ঘ সময়ের মধ্যে একাধিক ধারায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই ধারাগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান, জোটনীতি ও কর্মসূচির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ফলে “জাসদ” নামটি এখন শুধু একটি দলের পরিচয় নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি দীর্ঘ এবং বিভক্ত উত্তরাধিকার।

জাসদের আদর্শচ্যুতির প্রশ্নটিও তাই সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। আদর্শ পরিবর্তন রাজনৈতিক দলের স্বাভাবিক বিবর্তনের অংশ হতে পারে। একটি দল সময়ের সঙ্গে কৌশল পরিবর্তন করতে পারে, নির্বাচনী রাজনীতিতে আসতে পারে, জোট গঠন করতে পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন যদি দলের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শনের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে এবং জনগণের কাছে তার ব্যাখ্যা স্পষ্ট না থাকে, তখন রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট তৈরি হয়। জাসদের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের জোট রাজনীতি ও ধারাবাহিক সাংগঠনিক বিভাজন সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র করেছে।সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জাসদ কি তার ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্য নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারবে? দলটির সামনে এখন কেবল অতীতের বিভক্তি মেরামতের প্রশ্ন নয়, বরং রাজনৈতিক দর্শনের পুনর্ব্যাখ্যার প্রশ্নও রয়েছে। সমাজতন্ত্র বলতে আজ কী বোঝাবে, রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে জনগণের ভূমিকা কী হবে, বাজার ও রাষ্ট্রের সম্পর্ক কী হবে, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার কীভাবে নিশ্চিত হবে, দুর্নীতি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কী কার্যকর কর্মসূচি থাকবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কীভাবে জবাবদিহির আওতায় আসবে এবং রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে, এসব প্রশ্নের বাস্তব উত্তর প্রয়োজন।

রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি শিক্ষা হলো, কেবল বিপ্লবী স্লোগান কোনো দলকে দীর্ঘদিন প্রাসঙ্গিক রাখতে পারে না। আবার কেবল ক্ষমতার অংশীদারিত্বও কোনো দলের আদর্শিক পরিচয় নিশ্চিত করে না। একটি রাজনৈতিক দলের স্থায়ী শক্তি আসে আদর্শ, সংগঠন, জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বাস্তব কর্মসূচির সমন্বয় থেকে। জাসদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রায় এই চারটির মধ্যে ভারসাম্য কতটা বজায় ছিল, সেটিই আজকের আলোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।

পাঁচ দশকের বেশি সময় পর জাসদের সামনে তাই অতীতকে পুনরাবৃত্তি করার সুযোগ নেই। প্রতিষ্ঠার ইতিহাস অবশ্যই তার রাজনৈতিক সম্পদ, কিন্তু সেই ইতিহাসের ওপর নির্ভর করে বর্তমানের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, আদর্শিক স্বচ্ছতা, সাংগঠনিক গণতন্ত্র এবং জনগণের বাস্তব সমস্যা নিয়ে সুস্পষ্ট কর্মসূচি। একই সঙ্গে প্রয়োজন বিভক্তির রাজনীতি থেকে বেরিয়ে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সাংগঠনিক ধ্বংসের বদলে গণতান্ত্রিক বিতর্কের মাধ্যমে পরিচালনা করা।

জাসদের ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনীতিকে একটি কঠিন প্রশ্নও করে দেয়: যে রাজনৈতিক দল শোষণমুক্ত ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সে নিজেই কেন এতবার বিভক্ত হলো? কেন আদর্শিক ঐক্য নেতৃত্বের দ্বন্দ্বের কাছে দুর্বল হয়ে পড়ল? কেন বৃহত্তর জোটের রাজনীতিতে দলটির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় বারবার আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা শুধু জাসদের জন্য নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দল ভাঙা, নতুন দল তৈরি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি যদি রাজনৈতিক সংগঠনের স্বাভাবিক পরিণতিতে পরিণত হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি উভয়ই দুর্বল হয়। আর যদি মতপার্থক্যকে গণতান্ত্রিকভাবে ধারণ করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক দল বিভক্ত না হয়েও পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে নিজেকে নতুনভাবে সাজাতে পারে।

জাসদের সামনে এখন সেই কঠিন আত্মসমালোচনার সময়। হাজার হাজার মেধাবী তরুণদের আত্মত্যাগের গড়া দলের ইতিহাসের গৌরব যেমন অস্বীকার করার নয়, তেমনি ইতিহাসের ভুল থেকেও চোখ ফিরিয়ে থাকার সুযোগ নেই। ১৯৭২ সালের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন থেকে ২০২৬ সালের বহুদা বিভক্ত বাস্তবতা পর্যন্ত জাসদের পথচলা তাই শুধু একটি দলের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক আদর্শ, নেতৃত্ব, জোটনীতি ও সাংগঠনিক সংস্কৃতিরও একটি আয়না। সেই আয়নায় তাকিয়ে ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করাই এখন জাসদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। নতুবা প্রশ্নটি বারংবার সামনে আসবে জাসদ নামের আদর্শিক সংগঠনটি বারংবার কি ভুল পথের পথযাত্রী?নাকি ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থে মত্ত থেকে কর্মীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার নজির।

লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Exit mobile version