শেখনিউজ রিপোর্টঃ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানার বিরুদ্ধে তথ্য ক্যাডারের পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পক্ষপাত এবং উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি আড়াল করতে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, কর্মকর্তা বদলিতে প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বঞ্চনার দাবি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন
বিগত সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন, প্রকল্পে কাজ, বিদেশে প্রশিক্ষণ এবং ধারাবাহিক পদোন্নতির সুযোগের সঙ্গে মাহবুবা ফারজানার কথিত বঞ্চনার দাবির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তার কর্মজীবন সম্পর্কে উত্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থ বিভাগের SEIP ও SIIP প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি বিদেশে প্রশিক্ষণ ও সফরের সুযোগ পেয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও অনুমোদিত সুযোগ গ্রহণ নিজে অনিয়মের প্রমাণ নয়। তবে বঞ্চনার দাবি মূল্যায়নে তার পদায়ন, পদোন্নতি, লিয়েন এবং প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের পূর্ণ রেকর্ড প্রাসঙ্গিক। কোন সময়ে, কোন সিদ্ধান্তে এবং কীভাবে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন, সেই ব্যাখ্যার সঙ্গে কর্মজীবনের রেকর্ড মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তথ্য ক্যাডারের পদোন্নতিতে বাধার অভিযোগ
তথ্য ক্যাডারের শূন্য পদে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সভা আহ্বান ও প্রস্তাব নিষ্পত্তিতে অযৌক্তিক বিলম্বের অভিযোগ উঠেছে সচিবের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, গোয়েন্দা যাচাইয়ের কথা বলে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা হয়েছে, যার ফলে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি আটকে রয়েছে।
সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে পদাধিকারবলে সদস্য হিসেবে তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, পদোন্নতির প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে তিনি এমন অবস্থান নিয়েছেন, যা তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করেছে।
কতটি পদ শূন্য ছিল, কতজন কর্মকর্তা পদোন্নতির যোগ্য ছিলেন, প্রস্তাব কবে পাঠানো হয়েছে এবং কোন পর্যায়ে কত দিন আটকে ছিল—এসব তথ্যেই বিলম্বের দায় নির্ধারণ করা সম্ভব। গোয়েন্দা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়ে থাকলে তার বিধিগত ভিত্তি এবং প্রয়োগের মানদণ্ডও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ
অর্থ বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে মাহবুবা ফারজানার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পভিত্তিক দায়িত্ব, পারিশ্রমিক এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট হিসাব ও অনুমোদনের নথি পরীক্ষা প্রয়োজন।
প্রকল্পের ব্যয় বিবরণী, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পর্যালোচনা করলে অভিযোগগুলোর সত্যাসত্য নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হবে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তার পরিমাণ, পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে হবে।
বেতারের দুর্নীতি আড়ালে আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ
বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক শাদাত জাহিদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগ আড়াল করতে সচিব আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে বেতারের কথিত অনিয়ম এবং সেই অভিযোগ নিষ্পত্তিতে সচিবের ভূমিকা পৃথকভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। অভিযোগ পাওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তদন্ত বা বিভাগীয় কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছিল কি না এবং কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে অননুমোদিত প্রভাব ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সংশ্লিষ্ট নথি থেকে পাওয়া যেতে পারে।
কর্মকর্তা বদলিতে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা রিয়াসাতকে বদলির পর পুনরায় ফিরিয়ে আনার পেছনে সচিবের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক প্রয়োজন, নাকি ব্যক্তিগত পছন্দের ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছিল, তা বদলির আদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি থেকে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
কর্মকর্তা নিয়োগ ও বদলিতে একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয়। ব্যক্তিবিশেষকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগের মূল্যায়নে একই ধরনের অন্য সিদ্ধান্তের সঙ্গে তুলনা প্রয়োজন।
ভারতীয় সাংবাদিকের সঙ্গে কথিত যোগাযোগ
ভারতীয় এক সাংবাদিকের সঙ্গে সচিব মাহবুবা ফারজানার কথিত সম্পর্ক নিয়ে মন্ত্রণালয়ে কানাঘুষা রয়েছে। এই যোগাযোগের মাধ্যমে কোনো সংরক্ষিত বা স্পর্শকাতর সরকারি তথ্য অননুমোদিতভাবে হস্তান্তর হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
গণভোটে বক্তব্য ও প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা
২০২৬ সালের গণভোট উপলক্ষে রাজশাহীর একটি সরকারি অনুষ্ঠানে মাহবুবা ফারজানা প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি সরকারি দায়িত্ব পালন ও রাজনৈতিক প্রচারণার সীমা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বক্তব্যের পূর্ণ রেকর্ড, অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য এবং সে সময়ের সরকারি নির্দেশনা পর্যালোচনা করেই তার ভূমিকা মূল্যায়ন করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে বিভাজন তৈরির অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে।
সমন্বয়হীনতায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ
মন্ত্রণালয় ও অধীন দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সরকারের নীতি ও কার্যক্রম গণমাধ্যমে পৌঁছানো ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জনসংযোগ কার্যক্রমে বিলম্বের কারণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কাজেও সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কোন সিদ্ধান্ত কত দিন আটকে ছিল, কোন দপ্তরে বিলম্ব হয়েছে এবং তার লিখিত কারণ কী ছিল, তা নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় নির্ধারণে সিদ্ধান্তের সময়ক্রম ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা পরীক্ষা করতে হবে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন
চাকরির মেয়াদ শেষে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার জন্য মাহবুবা ফারজানা তৎপরতা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এমন কোনো নিয়োগ বিবেচিত হলে তার কর্মমূল্যায়ন, নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা এবং উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তির অবস্থা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের মূল্যায়ন হওয়া উচিত কাজের ফল, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহির ভিত্তিতে। পদোন্নতি আটকে রাখা, সরকারি অর্থের অপব্যবহার ও দুর্নীতি আড়ালের অভিযোগ অনিষ্পন্ন রেখে দিলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে। স্বাধীন ও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি এবং দায় পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।
