শেখনিউজ রিপোর্ট: বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে অসন্তোষ, হাঙ্গামা, মারামারি এমনকি দাঙ্গার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। যেভাবে একই দিনে সারা দেশে গণভোট ও সংসদীয় ভোট (২ টি ভোট) গ্রহণের সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে সেটিকেই একটি ষড়যন্ত্র বলে অনেকেই মনে করছেন।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিনে সক্ষমতার বাইরে ভোট আয়োজনকে একপক্ষ মনে করছে কোন নির্দিষ্ট দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়ার চক্রান্ত। তেমনি অন্যপক্ষ মনে করছে ভোট না দিতে পেরে নাগরিকদের দ্বারা যে রায়ট পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে তাতে অন্য কোন পক্ষ ঘোলা পানিতে শিকার করবে।
ভোটগ্রহণের সক্ষমতা ও বাস্তবতার মধ্যে বিদ্যমান গুরুতর ফাঁক দিয়ে এই নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য ও নিজস্ব অপারেশনাল নির্দেশনার ভিত্তিতে করা এক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে—নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব ভোটারকে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন উঠছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতি ৩ হাজার ভোটারের জন্য একটি ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসাবে সারাদেশে মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়ায় আনুমানিক ৪২ হাজার ৫৭টি।
ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ভোটকক্ষ বা বুথ নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতি ৬০০ জন পুরুষ ভোটারের জন্য একটি এবং প্রতি ৫০০ জন নারী ভোটারের জন্য একটি ভোটকক্ষ স্থাপন করার নির্দেশ রয়েছে প্রজ্ঞাপন আকারে। এই হিসাবে সারাদেশে মোট ভোটকক্ষ বা বুথের সংখ্যা দাঁড়ায় আনুমানিক ২ লাখ ৩০ হাজার ৯৯৭টি।
ভোটগ্রহণের সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত, অর্থাৎ মোট ৯ ঘণ্টা। এবারের নির্বাচনী কাঠামোয় প্রতিটি ভোটারকে দুটি ব্যালট প্রদান করা হচ্ছে—একটি সংসদ নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটি গণভোটের জন্য। ফলে একজন ভোটারের ভোট প্রদান করতে আগের তুলনায় স্বাভাবিকভাবেই বেশি সময় প্রয়োজন হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় ভোটগ্রহণ সক্ষমতা নিয়ে করা তাত্ত্বিক হিসাব বলছে, যদি একজন ভোটার গড়ে দুটি ব্যালট দিতে ৪ মিনিট সময় নেন, তাহলে ৯ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ প্রায় ৩ কোটি ১১ লাখ ভোটার ভোট দিতে পারবেন। সময় যদি গড়ে ৩ মিনিট হয়, তাহলে এ সংখ্যা বাড়তে পারে প্রায় ৪ কোটি ১৫ লাখে। আর অত্যন্ত দ্রুতগতির ব্যবস্থাপনায় যদি গড়ে ২.৫ মিনিটে ভোট দেওয়া সম্ভব হয়, তবুও সর্বোচ্চ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৯৯ লাখের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, যদি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৭০ শতাংশ হয়, তাহলে ভোট দিতে আসবেন প্রায় ৮ কোটি ৯৪ লাখ মানুষ। আর ৮০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে এ সংখ্যা ছাড়িয়ে যাবে প্রায় ১০ কোটি ২২ লাখ। অর্থাৎ বিদ্যমান ৪২,০৫৭টি ভোটকেন্দ্র ও ২,৩০,৯৯৭টি ভোটকক্ষের কাঠামোর মধ্যে নির্ধারিত সময়ের ভেতরে তাত্বিকভাবে যে সংখ্যক ভোটার ভোট দিতে পারবেন, তার তুলনায় উপস্থিত ভোটারের সংখ্যা অনেক বেশি।
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই ব্যবধান কেবল একটি পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ভোট দিতে না পারলে ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং তা বিস্ফোরিত হবেই।
নিকট অতীতে রাজনৈতিক মতভেদ এবং ফ্যাসিবাদী আচরণের কারণে সরকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে নাগরিকদের সহিংস হয়ে ওঠাও জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। তাই ভোট নিয়ে কোনরূপ সন্দেহ তৈরী হওয়ার যেকোন পরিস্থিতিতে স্থানীয় ও স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশংকা প্রবল।
নিরাপত্তা বাহিনীর হস্তক্ষেপ, সময় শেষ হয়ে যাওয়ার আগে ভোটকেন্দ্র বন্ধ হওয়া বা ভোটকক্ষে প্রবেশের সুযোগ না পাওয়া—এ ধরনের পরিস্থিতি উত্তেজনা আরও বাড়াতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় নির্বাচনকেন্দ্রিক অস্থিরতায় সংঘর্ষ, আহত এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে ভোট দিতে না পারার বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে সীমিত থাকছে না; এটি জননিরাপত্তা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা। তাছাড়া আসন্ন নির্বাচনটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্পর্শকাতর হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
এই অবস্থায় পর্যবেক্ষকদের অভিমত, ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় যদি অতিরিক্ত কোনো ব্যবস্থা—যেমন ভোটগ্রহণের সময় বাড়ানো, ধাপে ধাপে ভোট, অথবা ডাকযোগে ও বিশেষ ভোটের প্রকৃত সংখ্যা ও পদ্ধতি সম্পর্কে আগাম ও স্বচ্ছ তথ্য—স্পষ্টভাবে জানানো না হয়, এবং সর্বোপরি ভোটারগণ যদি ভোট প্রদান করতে ব্যুর্থ হয়, তাহলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আরও বড় প্রশ্ন উঠতে পারে। এবং সেটি একটি সহিংস পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটাবে যা নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রের সক্ষমতার বাইরে চলে যাবে।
বি:দ্রঃ এই রিপোর্টের সাথে সংযুক্ত ছবিটি কাল্পনিক; নির্বাচনে ব্যর্থতার প্রেক্ষিতে যা হতে পারে বাংলাদেশে। অবশ্যই জাতি এমন পরিস্থিতিতে নিপতিত হোক এটা সম্পদকীয় নীতি নয়।
