শেখনিউজ ডেস্ক: ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর বাতিলের দাবিতে শনিবার উত্তাল হয়ে ওঠে রাজধানী দিল্লি। দিনভর ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা, ব্যারিকেড, আটক ও বিক্ষোভের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবালসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের বহু নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে।
দিল্লির সাউথ অ্যাভিনিউ এলাকায় নিজের অবস্থানস্থল থেকে বের হতে বাধা পাওয়ার পর দলীয় সাংসদদের সঙ্গে সড়কে বসে ধর্না শুরু করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিছু সময় পর দিল্লি পুলিশ তাকে আটক করে। তার সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, প্রতিমা মণ্ডল, সাকেত গোখলেসহ অন্য নেতারাও আটক হন।
ঘটনার একটি ভিডিয়ো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে মমতাকে দলীয় নেতাদের নিয়ে রাস্তায় বসে থাকতে এবং পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। পরে পুলিশ সদস্যরা তাকে এবং তার সঙ্গে থাকা নেতাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যান।
মমতার আটকের ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে বড় ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচির ডাক দেয়। সকাল থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয় দিল্লি পুলিশ। প্রধান সড়কগুলোতে ব্যারিকেড বসানো হয় এবং যন্তর মন্তরে যাওয়ার বেশ কয়েকটি পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। রয়টার্স জানিয়েছে, প্রতিবাদ ঠেকাতে শত শত বিক্ষোভকারী ও বিরোধী নেতাকে আটক করা হয়েছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পর বিমান থেকেই আটক করা হয়। তার সঙ্গে ছিলেন সংগঠনের নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কা। বিভিন্ন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, আন্দোলনকারীরা যাতে যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে না পারেন, সে জন্য সকাল থেকেই ধরপাকড় চালায় পুলিশ।
বিক্ষোভে যোগ দিতে বেরিয়ে আটক হন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভানেত্রী নেহা বোরাও। যন্তর মন্তরে কঠোর নিরাপত্তার কারণে আন্দোলনকারীরা দিল্লি হাট এলাকায় জমায়েতের চেষ্টা করলে সেখানেও পুলিশ তাদের বাধা দেয়। নেহাকে একটি পুলিশ বাসে তুলে নেওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা বাসটি ঘিরে ধরে বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
দিনের আরেক পর্যায়ে আটক হন আম আদমি পার্টির প্রধান ও দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবাল। তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে আয়োজিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন।
বামপন্থী রাজনৈতিক নেতাদেরও আটক করা হয়। কেরালার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, বৃন্দা কারাট, এম এ বেবিসহ সিপিআইএমের একাধিক শীর্ষ নেতা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার সময় আটক হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীকেও গুরুগ্রাম থেকে আটক করার খবর পাওয়া গেছে। তিনি দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
আটক আইনজীবী, হস্তক্ষেপ প্রধান বিচারপতির
বিক্ষোভের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট চত্বরেও। সেখানে প্রতিবাদে অংশ নিতে যাওয়া একদল আইনজীবীকে পুলিশ আটক করে বলে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করে।
আইনজীবীদের আটকের ঘটনায় ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের হস্তক্ষেপ চায় সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন। পরে আটক আইনজীবীদের মুক্তি দেওয়া হয়। লাইভ ল, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং অন্য ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন অভিযোগ করে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়া আইনজীবীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা হয়েছে এবং নারী আইনজীবীসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
বিক্ষোভের কেন্দ্রে ভোটার তালিকা
শনিবারের আন্দোলনের মূল দাবি ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিল করা।
বিরোধী রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন বিজেপিকে রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছে। নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, অযোগ্য ও নকল নাম বাদ দিয়ে তালিকা সংশোধন করাই এ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য।
সিজেপির ডাকে যন্তর মন্তরের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ, ব্যারিকেড এবং আটক অভিযান চালানো হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের হিসাবে আটক মানুষের সংখ্যা কয়েক হাজার পর্যন্ত পৌঁছেছে, যদিও সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে না দেওয়া হলেও যেখানেই তাদের আটক করা হবে, সেখানেই আন্দোলন চলবে। ফলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট প্রতিবাদ ও জমায়েত ছড়িয়ে পড়ে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অরবিন্দ কেজরীবাল, পিনারাই বিজয়নসহ জাতীয় পর্যায়ের একাধিক বিরোধী নেতা আটক হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনবিরোধী এ আন্দোলন ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
সূত্র: রয়টার্স, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, লাইভ ল এবং ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।
