মেজর সিনহা কি কোন গোপন মিশনে ছিলেন? সেনা ও পুলিশ প্রধান হত্যাকাণ্ড বললেন না কার স্বার্থে?

310

শেখনিউজ রিপোর্টঃ এসএসএফের সাবেক চৌকশ অফিসার মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান (অব) কি কোন গোয়েন্দা সংস্থার গোপন কোন মিশনে ছিলেন? সেই মিশনের কথা কি টার্গেট গ্রুপ জেনে গিয়ে তাকে হত্যা করিয়েছে? ডিজিএফআই এই হত্যা সম্পর্কে রিপোর্ট দেয়ার পরেও কিভাবে সেনাপ্রধান ও পুলিশ প্রধান হত্যাকাণ্ডটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বললেন? তবে কি এই হত্যাকাণ্ড কোন উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে ঘটেছে? নাকি অন্য দেশের ইশারায় ঘটেছে? নাকি ড্রাগ মাফিয়াদের ইচ্ছায় ঘটেছে? লিয়াকত ৪ টি গুলি করলেও বাকি ২ টি গুলি করেছে কারা? কিভাবে?

ডিজিএফআই-র রিপোর্ট সত্বেও সরকার অদ্যাবদি মেজর সিনহার হত্যার বিষয়ে কোন মামলার করার উদ্যোগ নেয়নি বা গ্রেপ্তার ও সাসপেন্ড করার কোন উদ্যোগ নেই হত্যাকারীদের। তাই নানান প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে মেজর সিনহার হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে। এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ডিজিএফআই-র রিপোর্টটি খুবই স্পর্শকাতর। রিপোর্টে রয়েছে রাত ২১ঃ০০ টায় মেজর সিনহাকে কোন সুযোগ না দিয়েই লিয়াকত পর পর ৩ টি গুলি করে। এএ আগে লাইসেন্স করা পিস্তলটি গাড়িতে রেখেই মেজর সিনহা হাত তুলে বের হয়ে আসেন। ঘটনার অল্পকিছু পরেই আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের (এএসইউ) এক সার্জেন্ট ঘটনাস্থলে এলে পুলিশ তার মোবাইল ও পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাকে বসিয়ে রাখে। এ সময় মেজর সিনহা জীবিত ছিলেন।

এরপর মেজর সিনহার সঙ্গি সিফাতকে আটক করে রাখা হয়। একটি মিনিট্রাক এনে রাত ২২ঃ০০ টায় জীবিত মেজর সিনহাকে উঠিয়ে হাসপাতালে নেয়া হয় এবং হাসপাতালে যেতে পুলিশের ও মিনি ট্রাকটি ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট সময় নেয়, যেখানে সময় লাগার কথা ১ ঘণ্টা। এ সময় ক্ষেপণ করা হয় সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করতে। এ সময় তাকে আরও ২ টি গুলি করা হয়, যে গুলিবর্ষণকারীর তথ্য এখনও অজ্ঞাত।

ট্রাক ড্রাইভার বলেছেন, ওই সময়ে মেজর সিনহার প্রাণ ছিল। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সিনহার শরীরের ওপরের অংশ কর্দমাক্ত এবং বুক ও গলা গুলিবিদ্ধ ছিল। পরনে সামরিক পোশাক ও হাতকড়া লাগানোর দাগ ছিল। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এমনটাই বলা হয়েছে। এছাড়াও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে কুত্তার বাচ্চা বলে গালি দিয়ে গুলি করার পর খতম করে দিয়েছি বলে উল্লাস করেছিল আইসি লিয়াকত। এর পর ওসি প্রদীপ এসে সিনহার বুকে ও মুখে লাথি মেরে তার দেহ (তখনো নড়াচড়া করছিল) সরিয়ে ফেলতে বলে।

ইন্সপেক্টর লিয়াকতকে হত্যার আদেশ প্রদানকারী টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাস, এবং থানায় জিডি লিপিবদ্ধকারি এসআই দুলাল রক্ষিত লিয়াকতের ৪ টি গুলির তথ্য দিতে পারলেও বাকি ২ টি গুলির রহস্য এখনও অনাবিষ্কৃত। মেজর সিনহার সুরতহাল রিপোর্টে তার শরীরে ৬ টি গুলির চিহ্ন পাওয়া যায়।

এদিকে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করে অধীনস্থ ওসি, আইসিকে রক্ষা করতে সাফাই গেয়েছিলেন কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন। এতোবড় রিস্ক এসপি কেন নিয়েছিলেন? নাকি পুরো ঘটনাটি তারই তত্বাবধানে ঘটেছে? এটিও আলোচনায় রয়েছে।

ঘটনার পর সেনাসদরের এজি শাখা থেকে যেভাবে জরুরী রিপোর্ট দেয়া হয়েছে, যেভাবে ডিজিএফআই রিপোর্ট দিয়েছে, যেভাবে এএসইউ এর ফিল্ড অফিসার ঘটনার তথ্য নেয়ার চেষ্টা করেছেন এবং সর্বশেষ মেজর সিনহাকে যেভাবে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় দাফন করা হয়েছে তাতে স্বাভাবিক ভাবেই মনে হতে পারে তিনি দেশের বা বিদেশের কোন গোয়েন্দা সংস্থার কোন গোপন মিশনে টেকনাফে ছিলেন। কারন ইউটিউবের কোন ভিডিও করতে ১ মাসাধিককাল টেকনাফে থাকার কথা নয়।

তাছাড়া সেনাবাহিনীর তত্বাবধানে পর্যটকদের জন্য গড়ে তোলা মেরিন ড্রাইভকে কিলিং ফিল্ড বানিয়েছে পুলিশ। এখানে প্রদীপ কুমার দাস গং প্রায় ১৬১ জন নিরস্ত্র নাগরিককে বিচার বহির্ভূত হত্যা করেছে। হয়তো মেজর সিনহার গোপন মিশনের অবস্থান যে কোনভাবেই হোক রাষ্ট্রের শত্রুরা জেনে গিয়েই তাকে হত্যা করিয়েছে। হতে পারে তারা ড্রাগ মাফিয়া গ্রুপ, হতে পারে ভারতীয় কাউন্টার ইনটেলিজেন্ট গ্রুপ। উল্লেখ্য টেকনাফের সমুদ্র তীরে ভারতীয় র‍্যাডার বসানোর এক জবরদস্তি মূলক বসানোর পরিকল্পনা চলমান, যা বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরুপ।

দৃষ্টিকাড়া বিষয় হচ্ছে, (এক) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাতের অনুমোদন না পেলেও অজ্ঞাত কারনে ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলি মেজর সিনহা হত্যার ২ দিন পূর্বে পুলিশের আইজি বেনজির আহমেদের সাথে পুলিশ সদর দপ্তরে সাক্ষাত করেন। (দুই) মেজর সিনহাকে কোন কথা বলার সুযোগ না দিয়েই গুলি করা হয়, অতিরিক্ত ২ টি গুলির হদিস নেই। (৩) আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের সার্জেন্ট-র আইডি ও মোবাইল কেড়ে নেয়া হয়। (৪) মৃত্যু নিশ্চিত করতে সময় ক্ষেপণ করা হয়। (৪) প্রথম থেকেই পুলিশ সুপার মাসুদ হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাইতে থাকেন। (৫) প্রথম থেকেই সেনাসদর ও ডিজিএফআই মেজর সিনহার অবস্থানের পক্ষে তাদের প্রতিক্রিয়া দেখায়। (৬) সেনা প্রধান ও পুলিশ প্রধান অজ্ঞাত কারনে বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করেন। (৭) এ পর্যন্ত হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার বা সাময়িক সাসপেন্ডও করা হয়নি যদিও তদন্ত শুরু হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে।

ডিজিএফআই-র রিপোর্ট সত্বেও সরকার অদ্যাবদি মেজর সিনহার হত্যার বিষয়ে কোন মামলার করার উদ্যোগ না নিলেও এ ঘটনার বিচার চেয়ে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন মেজর সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। আদালতের বিচারক তামান্না ফারাহ মামলাটি গ্রহণ করেন। তিনি এজাহারটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করে সাত দিনের মধ্যে আদালতকে অবহিত করতে টেকনাফ থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।

পাশাপাশি মামলাটি তদন্ত করে আদালতকে জানানোর জন্য র‌্যাব-১৫ কক্সবাজার ক্যাম্পের অধিনায়ককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। মামলা নং সিআরঃ ৯৪/২০২০ ইং টেকনাফ। ধারা দন্ড বিধির ৩০২, ৩০১ ও ৩৪। মামলাটি রুজু করার সাথ সাথে সকল আসমীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী করা হয়। যা এখন হত্যার পক্ষালম্বনকারিদের জন্য নয়া চ্যালেঞ্জ। এটি সঠিক কোর্সে না চললে হত্যার সাথে জরিতদের চরিত্র ফাঁস হয়ে যাবে।

ঘটনা তদন্তে মাঠে রয়েছে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাসহ একাধিক সরকারি সংস্থা। এছাড়াও ঘটনা তদন্ত করছেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত টিম।

তবে এ বিষয়টি সহজেই মিমাংসার মধ্যে নেই; যদি মেজর সিনহা কোন রাষ্ট্রীয় বা বিদেশি সংস্থার গোপন মিশনে জড়িত থাকেন, তবে এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত কেউ কেউ সহসাই উধাও হয়ে গেলে বা বেঘোরে নিহত হলেও আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

Facebook Comments

Hits: 144

SHARE