অথঃ কিলার পুলিশনামা

189

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জনপ্রিয়তা নিয়ে সঠিক তথ্য দেয়া না গেলেও বাংলাদেশের নাগরিকদের মধ্যে সেনাবাহিনী ও পুলিশের মধ্যে জনপ্রিয়তায় কে এগিয়ে এটি চোখ বন্ধ করে একটি শিশুও বলে দিতে পারে। এর কারন কি কেউ ভেবে দেখেছেন? পুলিশে এতো বড় বড় বাঘা বাঘা অফিসার বা আইজি এলেন গেলেন, কেউ কি এ বিষয়ে ভেবে পুলিশের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সঠিক উদ্যোগ নিয়েছেন?

এক কথায় না, কেউ নেন নাই। সবাই চেয়েছেন, পুলিশ জনগণের সামনে মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে থাকুক; এতে অন্তত টাকা পয়সা কামাই করতে সুবিধা বহাল থাকবে। আর জনতার ভয় ও ঘৃণার সুযোগে পুলিশের ক্যাডার অফিসারেরা সিপাহি থেকে দারোগা পর্যন্ত সবাইকে অন্তত বাসার চাকরের বা চৌকিদারের মতো ব্যবহার করতে পারছেন। যেটি জনপ্রিয় পুলিশ বাহিনীতে সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের পুলিশকে জনগন বড়জোর ঘুষখোর একটি বাহিনী হিসেবে জানতো, যারা টাকার বিনিময়ে যে কোন আসামিকে ১ নম্বর থেকে ২০ নম্বরে নিয়ে চার্জশীট দিতে পারতো, পারতো চার্জশীট থেকে নাম কেটে দিতে; আদালতে স্বাক্ষি ঠিকমত না দিয়ে অপরাধীকে মুক্তির সুযোগ দিতে। মাঝে মধ্যে আসামিকে নির্যাতন করতে গিয়ে বেফাস ২/১ জন মারা যেতো পুলিশ হেফাজতে। তবে সেই পুলিশের আচরণও কখনো নর্মাল গুন্ডা খুনি বা বদমাশদের মতো ছিল না। পুলিশের ভালো কাজও ছিল অনেক; কিন্তু তাদের জনপ্রিয়তা ছিল না। কিন্তু সেই পুলিশ কালে কালে হয়ে উঠলো নাগরিক হত্যাকারী বাহিনীতে।

জনগণকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য যে পুলিশ বাহিনী গড়া হয়েছিল; আজকে সেই পুলিশ বাহিনীর কাছে নিরাপদ ভাবার মতো একজন নাগরিকও নেই। যারা রাজনৈতিক কারনে বর্তমান পুলিশের পক্ষে সামনে বলেন, আড়ালে জিজ্ঞেস করে দেখুন সেই উল্টো বলবে। কেউ গ্যারান্টি দেবে না পুলিশের হাতে নিরাপত্তার। একমাত্র ক্ষমতাসীন দলের নির্ধারিত কিছু লোকজন ছাড়া।

কিন্তু আর কতদিন চলবে এই অবস্থা? সম্প্রতি কথা হচ্ছিল এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তার সাথে, তাকে বললাম থানা পুলিশকে কেন নিরস্ত্র করে জনতার সাথে তাদের বন্ধু বানানো হয় নাই? তিনি বললেন শত চেষ্টা করলেও নিরস্ত্র পুলিশকে কেউ আপন ভাববে না। আমি বললাম একবারও কি সেই চেষ্টা করা হয়েছে? আমরা যারা ইউরোপে থাকি তারা নিরস্ত্র পুলিশ দেখতে অভ্যস্থ। ২/১ জন পুলিশ বা পুলিশের গাড়ি দেখলেও জনতা সজাগ হয়ে যায়। এটা ভয়ে নয়, আইনের প্রতি শ্রদ্ধায়। আমি বললাম সে চেষ্টা কি বাংলাদেশে কখনো হয়েছে? তিনি স্বীকার করলেন হয়নি। আমি বললাম, নিজের জীবনে অন্তত এমন একটি চেষ্টা করে যান।

বাংলাদেশে পুলিশ ও জনতার মধ্যে সম্পর্কের যে বিস্তর ফারাক তা ঐ অস্ত্রটির কারনে। দেশে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আছে, র‍্যাব আছে, আনসার আছে, অন্তত থানার পুলিশদের নিরস্ত্র রেখে জনতার কাছাআছি নেয়ার চেষ্টা করা হোক। থানার পাহারাদারকে সশস্ত্র রাখা হোক তাতে আপত্তি নেই; তবে তা পিস্তল রিভলবার এর মধ্যে থাকলেই চলবে। পাবলিক কখনই অস্ত্রহীন থানা লুট করতে যাবে না। তাছাড়া ঘুষের মাধ্যমে চাকুরী নিয়ে সারা জীবন ঘুষ প্র্যাকটিস করা যে বাহিনীর চিরায়ত অভ্যাস, তারা জনগণের বন্ধু কি হতে চায়? এটি জনতার প্রশ্ন।

আর অপরাধী আদালত কর্তৃক চিহ্নিত হওয়ার পরে পাকড়াও করার জন্য যে বাহিনীকে বা বাহিনীর অংশকে রাখা হবে, হতে পারে সিআইডি বা ডিবি বা পিবিআই বা র‍্যাব, যেই হোক তাদের বিচার বিভাগের অধীনে দিয়ে দেয়া হোক। এতে চেক এন্ড ব্যালান্স হবে। বিচার বিভাগ শক্তিশালী হবে। এটর্নি সার্ভিস শক্তিশালী হবে। পুলিশের দুর্নীতি কমবে, ঊর্ধ্বতনদের জন্য নিম্নপদের পুলিশদের টাকা রোজগারের চেষ্টা থাকবে না; থাকবে না অফিসারদের জমিদারি ভাব আর তৈরি হবে না ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলির মতো ঠাণ্ডা মাথার খুনি।

ওসি প্রদীপ কুমার বা এডিঃ ডিআইজি আক্কাছ উদ্দীন ভূইয়্যার মতো আড়ালে থেকে নিরস্ত্র মানুষ হত্যার মিডলম্যানদের বিষয় সরকারের কারনে মিডিয়াও এড়িয়ে যায়। যে কারনে জনতার ঘৃণা বেড়েছে ক্রমাগত পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে। পুলিশ কি পারে বা না পারে তার জলন্ত স্বাক্ষি আমি নিজেই।

কিন্তু এটা কি জাতির কাম্য? যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশের বিরুদ্ধে দেশব্যাপিী বিক্ষোভ হয়েছে সহিংস; তেমন কিছু বাংলাদেশে হলে কয়জন পুলিশ রক্ষা পাবেন সেটি কি কেউ ভাবছেন? বন্দী নিরস্ত্র মানুষকে মারতে মারতে এই পর্যন্ত নিয়ে আসায় কত পরিবার পথে বসেছে সেটি কি ভেবেছেন? নিহতদের সন্তানেরা কেউ যদি প্রতিশোধ নেয়া শুরু করে তবে কোথায় এর শেষ হবে কেউ কি জানেন? জানেন না; তাই কেউ পাত্তাও দেন না।

এর পরেও বলি, যে কারনে পুলিশ, সেই রকম জনগণের বন্ধু পুলিশ বানাতে যদি তেমন কোন আইজি সঠিক অবস্থান নেন, তবে একদিন কোন একসময় যদি দেখি পুলিশ জনপ্রিয়তায় সেনাবাহিনীকেও হারিয়ে দিয়েছে তাতে জাতিরই লাভ। কিন্তু অসৎ রাজনৈতিক দল বা সরকারের অধীনে সেই পুলিশ বানানো কি সম্ভব?

বিঃ দ্রঃ যারা ঘুষ খান না সেই সল্প সংখ্যক সৎ পুলিশ সদস্যদের স্যালুট দিয়ে এ বিষয়টি ব্যক্তিগতভাবে না নেয়ার জন্য তাদের বিনীত অনুরোধ করছি।

Facebook Comments

Hits: 92

SHARE