কি তৈরী করছি আমরা!

70

সাঈদ তারেকঃ ভাবতে অবাক লাগে এই ছেলেমেয়েগুলো এতটা নীতিনৈতিকতা-বিবেকবোধহীন অমানুষ হয়ে গড়ে উঠলো কিভাবে! রাস্তার টোকাই বা ফকির মিসকিন ঘরের সন্তান না, লেখাপড়াজানা সমাজের নামীদামী বাবা মা’র সংসারে বেড়ে ওঠা। সাহেদের কথা জানিনা, মফস্বল থেকে আসা কোন ছোটলোক বাবার নচ্ছার সন্তান হতে পারে কিন্তু ডা: সাবরিনা সম্পর্কে জানা গেল তার বাবা নাকি বাংলাদেশ সরকারের একজন সচিব ছিলেন। ‌মে‌য়ে‌কে ডাক্তারী পাশ ক‌রি‌য়ে‌ছেন। সাহেদের এক বউ রিশ্মি বিটিভির এক সময়ের এক নামকরা প্রযোজিকার মেয়ে। আমি এই ভদ্রমহিলাকে চিনতাম। ভাল মহিলা। তার মেয়ে কি করে এতবড় প্রতারক অমানুষ হতে পারে হিসাব মেলাতে পারি না।

সম্রাট শামিম পাপিয়ারা নিশ্চয়ই স্টেডিয়ামের বারান্দায় বা ফকিন্নী মাতারীর ঘরে জন্ম নেয়া নয়, প্রত্যেকেরই কিছুটা হলেও ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। লেখাপড়া করেছে। সমাজে চলাফেরার যোগ্যতা আছে। কিন্তু মাথায় শয়তানি বুদ্ধি ষোল আনা। নীতি-নৈতিকতার কোন বালাই নাই। মনুষত্ববোধ বলতে কিছু নাই। দেশপ্রেম মানবপ্রেম দুরের কথা টেস্টের ভূয়া রিপোর্টের সাথে যে হাজার হাজার মানুষের জীবন মরনের প্রশ্ন, দেশের মান সম্মান জড়িত- এই বোধটুকু পর্যন্ত নাই!

লাজ ফার্মার মত প্রতিষ্ঠান নকল মেয়াদোত্তীর্ণ অষুধ বিক্রি করে মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, বিবেকে একটুও বাধছে না! শুধু টাকা! আমি দেখছি স্বাধীনতাত্তোর কালের প্রজন্মের এক বিরাট অংশের ধ্যানজ্ঞান শুধু টাকা বিত্ত বৈভব। টাকার জন্য হেন অপকর্ম নাই করছে না। কেন!

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংসারে বাবা মা’র কাছ থেকে এরা কি শিক্ষা পেয়েছে? আমাদের বিদ্যাপীঠগুলোয় কি শেখানো হয়? বাবা মা’রা কিভাবে সন্তান বড় করেন? কেন ওদের এই মনস্তাত্বিক বৈকল্য ঘটলো? আমরা বাল্যকাল থেকেই নীতিকথা শুনে বড় হয়েছি। বইয়ে পড়তে হয়েছে ‘সদা সত্য কথা বলিবে’ ‘চুরি করা মহাপাপ’। যার যার ধর্মের শিক্ষাগুরুদের কাছ থেকে আদাব-লেহাজ ভদ্রতা, গুরুজনদের মান্য করা, অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা- এমনি যাবতীয় ভাল কাজ করা মন্দ কাজ থেকে দুরে থাকার শিক্ষা পেয়েছি। এইসব শিক্ষা কি আজকাল উঠে গেছে!

‘আদর্শপাঠ’ ‘বাল্যশিক্ষা’ বইগুলো কি বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছে! কি শিক্ষানীতি চালাচ্ছে সরকার! শুধুমাত্র পাশ? সার্টিফিকেট! জিপিএ ফাইভ! পরীক্ষার খাতায় নাকি আজকাল কিছু লিখতে হয়না, শুধুমাত্র টিকমার্ক দিলেই চলে! লিখতেই যদি না হয় তাহলে ছেলেমেয়েরা পড়বে কেন! কিসের সেমিস্টার পদ্ধতি! আমি তো দেখছি আমাদের আমলের এনালগই ভাল ছিল। অন্তত: ছেলেমেয়েরা মানুষ হতে পারতো। সাবরিনা সাহেদ সৃস্টি হতো না। এখন তো বিবেকবোধহীন এক একটা রোবট তৈরী হচ্ছে!

বৃটিশ আমলের শিক্ষানীতির লক্ষ্য ছিল রাইটার বা কেরানী তৈরী করা। সরকারী কাজের জন্য তখন প্রচুর কেরানীর দরকার পড়তো। এই কেরানী বা রাইটাররা কলকাতায় যে অফিসে বসে কাজ করতো তার নাম ছিল রাইটার্স বিল্ডিং। ওটাই ছিল সরকারের সচিবালয়। বিল্ডিংটা বোধহয় এখনও আছে। তারপরও পয়সাওয়ালা দুই একজন বিলাত গিয়ে দুই পাতা ইংরেজী পড়ে এসে ‘সাহেব’ হয়ে যেতেন। কালীপ্রসন্ন সিংহ তার হুতোম পেঁচার নকশায় যাদেরকে ব্যঙ্গ করে বলেছেন ‘কমোডে হাগেন, কাগজে পোদ পোছেন’!

আমি তো দেখছি আমাদের শিক্ষানীতির লক্ষ্য হচ্ছে কামলা তৈরী করা! কোনমতে এসএসসি ইন্টারের ঘাটটা পার করিয়ে বিদেশে কামলা খাটতে পাঠাও! অনেককে স্কুলের চৌহদ্দিও পার হতে হয় না, নামসই শিখেই প্লেনে চেপে বসে! এই শিক্ষানীতির ফোকর গলিয়ে কিছু ছেলেমেয়ে উঁচু পাশ দেয়। কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশে যায়, আর ফেরে না। মধ্যবিত্তের একটা অংশ কোনমতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাপ পার করে বিসিএস, ব্যাংক বা বিভিন্ন সওদাগরী, কর্পোরেট অফিসে ঢুকে যায়। ধনাঢ্য বা ব্যবসায়ী শিল্পপতি পরিবারগুলোর সন্তানদেরকে বুদ্ধি হওয়ার পর থেকেই শেখানো হয় কিভাবে ট্যাক্স-ভ্যাট ফাঁকি দিতে হবে, কোন ব্যাংকের চেয়ারম্যান এমডির সাথে খাতির জমিয়ে লোন স্যাংশন করাতে হবে, লোনের টাকা কিভাবে মেরে দিতে হবে, কোন প্রভাবশালীকে দিয়ে কিভাবে বড় বড় কাজের কন্ট্রাক্ট বাগাতে হবে। অল্প বয়স থেকেই এই শ্রেণীটিকে যাবতীয় দুই নম্বরী কাজে সিদ্ধহস্ত করে তোলা হয়! আমাদের গোটা শিক্ষা ব্যবস্থায় মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা কোথায়! পারিবারিক শিক্ষাই বা কোথায়!

পেশাগত কাজে প্রায়ই আমাকে তরুন যুবকদের সান্নিধ্যে আসতে হয়। কেউ কেউ ভাল পাশ। কিন্তু অনেকের লেখাপড়া বা জানাশোনার দৌড়াত্ব দেখে হতবাক হয়ে যাই। অনেক বিষয়ে অনেকের ব্যাসিক জ্ঞানই নাই। ইংরেজী দুরের কথা বাংলাটাও ঠিকমত লিখতে পারে না! প্রায়ই দেখি নিজের নামের বানানটাও ভুল করে লিখেছে। সাধারন ভদ্রতা জ্ঞানটুকুর পর্যন্ত অভাব। সৌজন্যতাবোধ বলতে কিছু নাই। ফোনে কল দিলাম, ধরলো না, বা ধরে বললো পরে কলব্যাক করছি। আর খবর নাই। আসার কথা- এলো না, ফোন করে যে বলবে আসতে পারবে না সে বোধটাও নাই! কথার দাম নাই, সময়জ্ঞান নাই, কাজের প্রতি আন্তরিকতা নাই নিষ্ঠাবোধ নাই। সত্যের মুখোমুখি হবার সাহস নাই, সত্য বলার মনোবল নাই। চরিত্রগতভাবে পলায়নপর, শুধুমাত্র নিজের স্বার্থচিন্তায় বুঁদ হয়ে থাকা এক বিচিত্র জনগোষ্ঠী!

অদ্ভুত ব্যপার। আমরা তো এমন ছিলাম না! আরও কম বয়সী বা টীন-এজার বিশেষ করে বিত্তহীন বা নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর সন্তানদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। অধিকাংশই লেখাপড়া করে না, নানা পেশায় যুক্ত। লেখাপড়ার বালাই নাই। অনেকের কোন কান্ডজ্ঞানও নাই। এদেরকে কিছু শেখানোরও কেউ নাই!

এই হচ্ছে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম, জাতির ভবিষ্যত। এদের মাঝ থেকেই তৈরী হচ্ছে শামিম সাহেদ সাবরিনা সম্রাটরা। এরাই এক সময় দেশ চালাবে! চালাচ্ছে! ভাবা যায়! মাঝেমাঝে ভাবনায় পড়ে যাই কেউ কি এই জাতির চরিত্র মেধা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ধ্বংশ করে দেয়ার জন্য সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করে যাচ্ছে! সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল্যবোধের ধ্বশ! নইলে পঞ্চাশ বছরে যেখানে আমরা আরও সভ্য হবো উৎকর্ষিত হবো সংষ্কৃত হবো সেখানে এত অমানুষ পয়দা হচ্ছে কি করে!

লেখকঃ সাংবাদিক, নাট্যকার এবং রাজনীতিক

Facebook Comments

Hits: 39

SHARE