বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমীকরণঃ চলছে কুশীলবদের অস্থির পায়চারি

91

মারুফ কামাল খানঃ কয়েক দশক আগে পূর্ব-ইয়োরোপের সমাজতান্ত্রিক ব্লকভুক্ত দেশগুলোতে মহামারির মতন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক সমাজতান্ত্রিক শাসকদের পতন হতে থাকে। এরপর ‘গ্লাসনস্ত-পেরেস্ত্রৈকা’ মানে ভেতরে বাইরে সংষ্কার ও দুয়ার খোলা নীতির ধুন গাইতে গাইতে সোভিয়েত ইউনিয়নও ধ্বসে পড়ে। পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক শক্তিযুথের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটে। বিশ্ব হারায় সমরশক্তির ভারসাম্য। এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে। আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একক মোড়ল হিসেবে আবির্ভূত হয়।

সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকতেই সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো তিনটি ধারায় ভাগ হয়ে ছিল। (১) সোভিয়েত বলয়, (২) সোভিয়েত ইউনিয়নকে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের তাত্ত্বিক বিবেচনায় সংশোধনবাদী এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ বলে মনে করা দুই দেশ চীন ও আলবেনিয়া এবং (৩) এই দুই সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বাইরে দুর্বলদের নিয়ে তৃতীয় অক্ষশক্তি গড়ে তুলতে সচেষ্ট যুগোস্লাভিয়া ও কিউবার মতন নন-এলায়েন্ট বা নির্জোট সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো। নির্জোট নামের এই জোটের মধ্যে কিছু অসমাজতান্ত্রিক দেশও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে নির্জোটঅলারা কিছুটা সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকেই ঝুঁকে ছিল। আর চীন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা স্থাপন করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে।

এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বমোড়লদের ফোকাস সরে আসে এশিয়ায়, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর দিকে। তারা প্রথমতঃ এই অঞ্চলে সাবেক সোভিয়েত প্রভাবিত দেশগুলোর শাসকদের পতন ঘটানোর চেষ্টা শুরু করে। দ্বিতীয়তঃ ইরানে ইসলামের শিয়া মতবাদভিত্তিক ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাতাদের বিরুদ্ধে সব ফ্রন্টে লড়াই শুরু করে।

তৃতীয়তঃ ইসলামের সুন্নি মতাবলম্বীদের একটি অংশের মধ্যে ইসলাম ধর্মভিত্তিক যে রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রসার ঘটছিল তার বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াই শুরু করে।তাদের প্রথম উদ্যোগ সফল হয়। দ্বিতীয় উদ্যোগ তারা নেয় আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের মাধ্যমে দেশে দেশে ‘আরব বসন্ত’ নামের গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার। কিন্তু এই আন্দোলনে ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী ইখওয়ান বা ব্রাদারহুড মুভমেন্টের লোকেরা ঢুকে গিয়ে ফলাফল তাদের দিকে টানতে থাকায় খুব দ্রুতই থামিয়ে দেয়া হয় আরব বসন্তের ঝড়ের গতি।

শিয়া ইমামতের ধারণার আদলে গড়ে ওঠা ইরানী ইসলামী প্রজাতন্ত্রের আদর্শগত ভিত্তির বিপরীতে তারা পলিটিক্যাল ইসলামে বিশ্বাসী সুন্নীদের আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে খেলাফতের মডেলকে সামনে নিয়ে আসে। মধ্যপ্রাচ্যের সুন্নী মুসলমানদের একটি গোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও রসদে সজ্জিত করে গৃহযুদ্ধে ভঙ্গুর ইরাক ও সিরিয়ার একাংশ দখল করে সেখানে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেয়া হয়। এর মাধ্যমে ইরানকে দমানো না গেলেও দুটি সাফল্য অর্জিত হয়। কী সে সাফল্য তার ব্যাখ্যা দিচ্ছি।আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারির বিরুদ্ধে আমেরিকা-ইয়োরোপের মদতে পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা তালেবান বাহিনীকে যুদ্ধ শেষে ভেঙে দিতে গেলে বিরোধ বাধে। এই বিরোধের জের ধরেই আল-কায়দার সৃষ্টি হয়। এই আল-কায়দা তাদের সাবেক মদতদাতাদের জন্য মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই আল-কায়দার সিরিয়ায় যুদ্ধরত একটি বড় অংশকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার নামে সরিয়ে এনে আইসিস তৈরি করা হয়।

আল-কায়দাকে এই বিভক্তির মাধ্যমে আরো হীনবল করে ফেলা সম্ভব হয়। আল-কায়দাকে পরাভূত করার পর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ জারির মাধ্যমে আইসিস-কেও ছিন্নভিন্ন ও উৎখাত করা হয়। এই আইসিস ইসলামের নামে যত অপকর্ম করেছে তা ফলাও করে প্রচারের মাধ্যমে পলিটিক্যাল ইসলামকে ধিকৃত করা হয়। সালাফিস্ট সউদি আরব ছিল এককালে এই পলিটিক্যাল ইসলামের সবচেয়ে বড় মদতদাতা। তারাও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চাপের মুখে পুরোপুরি অ্যাবাউট টার্ন করে। আর সারা দুনিয়ায় ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী যুবশক্তিকে এই আইসিসে যোগ দেয়ার সুযোগ করে দিয়ে তাদেরকে সনাক্ত, ধ্বংস ও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সম্ভব হয়।

যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়দাকে দমনের পর তালেবানদের সঙ্গে সমঝোতার পথ ধরে। আইসিসকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের দিকে নজর দেয়ার চেষ্টা করছে। ইরান ইতোমধ্যে সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ফিলিস্তিন ও ইয়েমেন সহ বিরাট আরব অঞ্চলজুড়ে তার প্রভাব বিস্তৃত করেছে। সেই হাত ভেঙে দিতেই সম্প্রতি আরব অঞ্চলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইরানী সামরিক কমান্ডার মার্কিনী গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন।

দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও বহুমাত্রিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যদিয়ে তার বাস্তবায়নের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এত অল্প পরিসরে দেয়া কঠিন। এর অনেক স্রোত-উল্টোস্রোত, উপরের স্থির প্রবাহের গভীরে অনেক অদৃশ্য প্রবল স্রোত এবং ঘটনার ভেতরেও অনেক ঘটনা থাকে এবং ছিলও। সে সব এড়িয়ে মোটাদাগের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমি তুলে ধরেছি।আরেকটি কথা মনে রাখা দরকার ইসলামী খেলাফতের প্রতীকি অস্তিত্ব ওসমানীয় সালতানাতের পতন, আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফলের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের প্রতিষ্ঠাসহ রাষ্ট্রীয় যে মানচিত্রগুলো আঁকা হয় তা মূলতঃ ছিল সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনারই ফসল।

আধা-ট্রাইবাল এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্বার্থঘটিত ঐক্য ও সংঘাতের নানা ঘটনা সত্বেও এগুলো রাষ্ট্র হিসেবে কতটা সার্বভৌমত্বের অধিকারী তা নিয়ে বরাবরই প্রশ্ন রয়েছে। তবে চলমান ঘটনাপ্রবাহের অভিঘাত তাদেরকে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের পথে এগিয়ে দেবে কিনা এবং এই মানচিত্রগুলো নতুন করে বিন্যস্ত হবে কিনা তা নিয়েও ইতোমধ্যেই ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে।স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর এশিয়া থিয়েটারে ইরান ছাড়াও আমেরিকা-ইয়োরোপের কর্তৃত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায় চীন। ভারত ও জাপানের ওপর নির্ভর করে এই অঞ্চলে চীনের মোকাবিলায় মার্কিন কর্তৃত্ব বহাল রাখা সম্ভব কিনা তা নিয়ে এখন ইয়োরোপ-আমেরিকার চিন্তাবিদেরাই একমত হতে পারছেন না।

এর মধ্যেই ইরান নতুন এক উদ্যোগ শুরু করেছে। তাদের প্রস্তাব হচ্ছে, ইয়োরোপ-আমেরিকার একচ্ছত্র প্রতিপত্তিতে ভারসাম্য আনার জন্য রাশিয়া, চীন, ইরান, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি রাজনৈতিক-সামরিক ব্লক গঠন। এখনো এ আলাপ খুবই প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও তা’ দুনিয়াব্যাপী সম্প্রসারিত আমেরিকান রণাঙ্গনকে গুটিয়ে আনার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে থমকে দিয়েছে। প্রস্তাবিত এই জোটের দেশগুলোর মধ্যে ধর্ম, সংষ্কৃতি, রাজনীতি ও ঐতিহ্যগত দিক থেকে কোনো আদর্শিক মিল নেই। কেবল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক লেনদেন ও স্ট্রাটেজিক স্বার্থ এই প্রস্তাবকে কতটা অগ্রসর করতে পারবে তা বলার সময় এখনো আসেনি।

প্রস্তাবিত এ জোটের দু’টি রাষ্ট্র ইউরেশিয়াভুক্ত। রাশিয়া ও তুরষ্কের রাষ্ট্রীয় সীমানা এশিয়া ও ইয়োরোপ দুই মহাদেশেই পড়েছে। সে কারণে স্ট্রাটেজিক দিক থেকে এই দুই দেশের অবস্থানই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন পর্যন্ত ইয়োরোপ-আমেরিকার ‘ন্যাটো’ সমরজোটের অংশীদার তুরস্ক সেই জোট ভেঙ্গে বেরুতে পারবে কিনা, বেরিয়ে এলে তার ফায়দা কতটা হবে – সে প্রশ্নগুলোর জবাব এখনো অমীমাংসিত। তবে এককালে রুশ, চীন, ওসমানীয় (অটোমান) এবং পারস্য (ইরান) সাম্রাজ্যের অসামান্য শক্তিমত্তার বিবরণ জগতের ইতিহাসে লিপিবদ্ধ রয়েছে। আধুনিককালে জোটবদ্ধ হয়ে তারা আবার তাদের সেই পুরনো শক্তিমত্তা পুনরুজ্জীবনের জাতীয়তাবাদী স্বপ্নে বিভোর হতেও পারে। পাকিস্তানও একদা উপমহাদেশকেন্দ্রিক পরাক্রান্ত ও বিত্তশালী মুসলিম সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। কাজেই এই সম্ভাব্য জোটে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্তি পুরো উপমহাদেশকেই ক্রমান্বয়ে এই বলয়ভুক্ত করার দিকে নিয়ে যাবে কিনা তা নিয়েও রয়েছে নানামুখি জল্পনা-কল্পনা।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ঘাতক অতিমারী কোভিড-১৯ নিয়ে সবখানে ব্যাপক আতংক ও মৃত্যুর খতিয়ান চলাকালেই ঘটছে এসব ঘটনা। চীন-ভারত দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান হওয়ার পটভূমিতে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে চাঞ্চল্য ও প্রকাশ্য-গোপন সমীকরণ চলছে। এই দ্বন্দ্বে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ভূমিকারব্যাপারে অনিশ্চিত ভারত তার সোভিয়েত কালের পুরানা মিত্র রাশিয়ার সংগেও মিত্রতা বাড়াবার চেষ্টা করছে।

এই পটভূমিতে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমীকরণ কি দাঁড়াতে যাচ্ছে তা ভেবে পর্দার আড়ালে চলছে কুশীলবদের অস্থির পায়চারি। এখন রাষ্ট্রীয় রঙ্গমঞ্চ পুরোই অন্ধকার। দৃশ্যনাট্যের সাময়িক বিরতি চলছে। দর্শকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কখন আলো জ্বলবে, যবনিকা উঠবে, নাটকের নতুন অঙ্কের অভিনয়ের পালা শুরু হবে।

Facebook Comments

Hits: 62

SHARE