লে. জেনারেল সারওয়ার্দী’র অভিযোগের জবাব কই?

143

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ প্রথমেই বলে রাখি আমার এই লেখা সশস্ত্র বাহিনীকে খাটো করতে নয়; তবে গঠনমূলক ও গণতান্ত্রিক সমালোচনা করলে যদি কেউ অযথা বিগড়ে যান তাকে কেয়ার করা আমার অভ্যাসে নেই। আমার গ্রামের বাড়িতে এজেন্সির লোক পাঠালেই আমার পাতলুন খারাপ হবে এমনটা যারা ভাবেন তারা আসলেই সশস্ত্র বাহিনীতে থাকার অযোগ্য। যেমনটা চরম অযোগ্যতার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীর (অব) সাম্প্রতিক বক্তব্যের বিপরীতে তাদের প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কারো বিষ উগড়ে দিয়ে।

লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী (অব) যার রয়েছে বর্ণাঢ্য সামরিক বাহিনীর জীবন এবং চাকুরীকালীন যিনি সত্য কথা সরাসরি না বলে সর্বদাই জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বিষয়ে শেখ হাসিনা সরকারকে সহায়তা করেছেন নানান ভাবে; সেই জেনারেল সারওয়ার্দী যখন চাকুরী থেকে অবসর নিয়ে কিছুটা সত্য বলা শুরু করলেন দেখা গেলো এতে অনেকেরই মস্তিস্কে সমস্যা শুরু হয়ে গেলো।

লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী (অব) অনেক কথাই বলেছেন, কোন বাহিনীর সদর দপ্তর বা আইএসপিআর তার সেই অভিযোগের একটারও কি কোন উত্তর দিয়ে জাতিকে আশ্বস্ত করতে পেরেছে? নাকি জাতিকে আশ্বস্ত করতে হয় বা করা উচিত; না করলে তা জাতির অধিকারের প্রতি বেয়াদবি এটা বোঝার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন অফিসারের কি অভাব দেখা দিয়েছে? নাকি অদৃশ্য থেকে যারা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে চালানোর চেষ্টা করে ২৪ ঘণ্টা, সেই নেংটি পরা চাণক্যদের পদলেহনের কারনে সবকিছু জলাঞ্জলি দেয়া হয়েছে ইতিমধ্যেই?

আমার কথা হচ্ছে, লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী (অব)কে অবাঞ্চিত করা হোক, কোর্ট মার্শাল করা হোক, যা খুশি তাই করা হোক, এতে কোন বাঁধা নেই যদি তা সশস্ত্র বাহিনীর আইন ও সংবিধান সম্মত ন্যায়তভাবে হয়; কিন্তু সে যে অভিযোগের তীর ছুঁড়েছেন, জাতি যা শুনেছে তার পাল্টা জবাব কই? আমরা যারা দেখেছি জেনারেল সারওয়ার্দী চাকুরীকালীন জাতির স্বার্থের পক্ষে কথা বলেন নাই, এখন কার স্বার্থ দেখছেন তাও আমরা বুঝি, কিন্তু জাতি তারই প্রেক্ষিতে এর সমাধান চায়; জবাব চায়।

আইএসপিআর এর লোকজনকে কি দেশের প্রচলিত বা বৈশ্বিক গণতন্ত্র ও মানবাধিকার বা কারো ব্যক্তিগত বিষয়াদিসহ অন্যান্য বিষয়ে ছবক দেয়া হয়নি নাকি দেশের প্রচলিত অগণতান্ত্রিক নষ্ট রাজনৈতিক কালচারে অভ্যস্ত করে তোলা হয়েছে? আজকে যে আইএসপিআরকে আমরা দেখছি এরা কি আমাদের গৌরবের সশস্ত্র বাহিনীকে তার মর্যাদা মাফিক প্রতিনিধিত্ব করছে নাকি সশস্ত্র বাহিনীর মর্যাদা ও সুনামকে ধংসের প্রচেষ্টাগুলো করছে অবলীলায়?

আমার অভিজ্ঞতা ও সার্বিক প্রাপ্ত তথ্যে ধরা পড়েছে, লে. জেনারেল সারওয়ার্দী (অব) মুলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষেই তার বক্তব্য দিয়েছেন। ভারতীয় লেখক সুবীর ভৌমিক যাকে সবাই ভারতীয় এজেন্সির পক্ষে লেখক হিসেবে বাংলাদেশে মূল্যায়ন করেন সেই ভৌমিক ও তার পালকদের কারনেই জাতি জানে যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজকে সরিয়ে দিতে চাচ্ছেন; কিন্তু দিল্লীর ইচ্ছার কারনে সেটি তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারছেন না, যে কারনে ভারত ও ভারত বিরোধী উভয় পক্ষের দ্বারাই তিনি অদৃশ্য এক হুমকির মধ্যে বাস করছেন।

চীন ও পাকিস্তানের সাথে ভারতের শত্রুতা বাড়ার কারনে বাংলাদেশে সেনাপ্রধান পরিবর্তনকে ভারত তাদের বিরুদ্ধেই হুমকি হিসেবে দেখছে। কারন বাংলাদেশের সমতলভূমি ব্যবহার করতে না পারলে ভারতের মানচিত্র পরিবর্তন কেবল সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ রোধ করতে পারবে না, এটা জেনেই ভারত আমাদের সেনাপ্রধান সরানোর মতো ঝুঁকিতে যেতে চাচ্ছে না। তা ছাড়া বিজেবির প্রধান থাকাকাল থেকেই জেনারেল আজিজ যেভাবে দিল্লীকে সন্তুষ্ট করেছেন, তাতে তাকে ব্যবহার করেই চীনের সাথে শেখ হাসিনার মধুর সম্পর্ক রক্ষা করার বিপরীতে একপ্রকার অদৃশ্য হুমকি দিয়ে রাখছে দিল্লি। যেটি শেখ হাসিনাকে অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে। তাই শেখ হাসিনাই লে. জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী (অব) দিয়ে এই কথাগুলো বলিয়ে থাকতে পারে।

যে কারনে লে. জেনারেল সারওয়ার্দী (অব)কে খুঁজে পাওয়া এজেন্সির পক্ষে সম্ভব হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। যদিও বিশ্বাস ভঙ্গের খেলাও এই সকল বিষয়ে রয়েছে। যেমনটা লে. জেনারেল সারওয়ার্দীকে সেনাপ্রধান বানানোর আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল বলে প্রচার আছে।

তবে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজের বিষয়ে সেনাবাহিনীতেও অনেক অস্বস্তি বিরাজ করছে বলে অনেকেই জানিয়েছেন, কিন্তু চেইন অব কমান্ডের কারনে সবাই চুপ থাকছেন। তবে জেনারেল আজিজ জানেন তার চেইন অব কমান্ডের অধিকাংশ চেইনগুলো তাদের পেশাগত মনোভাবে চানক্য নেংটি বিরোধী। তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সত্যি সত্যি যদি চীনের দিকে ঝুকে পড়েন, তবে জেনারেল আজিজ ও অন্যান্য দিল্লীর তাবেদার অফিসারগণ ঝুঁকিতে আছেন, এটা ধরেই তাদের সতর্ক হওয়া উচিত জাতীয় স্বার্থে।

ইতিমধ্যেই লে জেনারেল সারওয়ার্দীর মতো বাংলাদেশের সীমাতরক্ষা বাহিনী বিজিবির সাবেক প্রধান লে.জে. (অব) মইনুল ইসলামও ভারতের বিরুদ্ধে তার অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি বিএসএফ বিজিবির বিরুদ্ধে যে বক্তব্য দিয়েছে সে বিষয়ে তিনি এর পেছনে ভারত সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা বলেছেন একটি বিদেশি মিডিয়ার কাছে।

আইএসপিআর তাদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে যে ভাষা ব্যবহার করে একজন সামরিক অফিসারকে তার অভিযোগের খণ্ডন না করে তাকে ব্যক্তিগত চরিত্র হননের মতো আক্রমন করেছে তা যেমন জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি, তেমনি গ্রহণযোগ্য হয়নি একজন নারী মিসেস ব্রাউনিয়াকে এইভাবে বিতর্কিত নারী বলার মতো অভব্য শব্দ ব্যবহার। এতে আইএসপিআরের ইজ্জত নষ্ট না হলেও সশস্ত্র বাহিনীর ইমেজে আঘাত করেছে। বিভিন্ন মিডিয়ায় আমার বা জেনারেল সারওয়ার্দীদের মতো কারো বিরুদ্ধে নষ্ট সংবাদ প্রকাশ করলেও সবাই বোঝে কারা করছে এগুলো, পেছলে কারা এর পৃষ্টপোষক।

একটা বিষয়ে সবাইকে সতর্ক করে দিতে চাই, এ সশস্ত্র বাহিনী আমাদের গৌরব, এ সশস্ত্র বাহিনীই আমাদের সার্বভৌমত্বের সরাসরি শত্রুদের বিরুদ্ধে মাথা উচু করে থাকার হাতিয়ার। সেই সশস্ত্র বাহিনীকে কেউ জাতির আকাংখার বিরুদ্ধে পরিচালিত করতে থাকলে যে কোন সময়েই তা বুমেরাং হতে পারে। এ জাতি সব সময়েই আনপ্রেডিক্টেবল। এখন যেমন ভীত সন্ত্রস্ত, এরাই আবার হয়ে উঠতে পারে আল্লাওয়ালা ভবনের ইট খুলে নেয়ার মতো ভয়ংকর।

লেখকঃ রাজনীতি, আইন ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

Facebook Comments

Hits: 94

SHARE