সার্বভৌমত্বের পথে নেপালঃ বিপাকে ভারত !

113

আবু জাফর মাহমুদ: হিন্দুদের কাছেও ভারতীয় সরকার পরিত্যক্ত হয়েছেন। নেপাল ছিলো শাসনতান্ত্রিকভাবে পৃথিবীর একমাত্র হিন্দুরাষ্ট্র।অথচ ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্রে রূপান্তরের রাজনৈতিক গন্তব্যে দৌঁড়ে থাকা বিজেপি সরকারের সাথে সরাসরি বিরোধ এখন নেপালি সরকারের। এ রাষ্ট্রটি হিন্দুরাষ্ট্র থাকা অবস্থাতে যুগের পর যুগ দেশ জাতির সমৃদ্ধি থেকে পিছিয়ে ছিলো। শাসনতন্ত্র সংশোধন করে ধর্মনিরপেক্ষ হয়ে উন্নয়ন সমৃদ্ধির জোয়াড়ে আত্নমর্যাদার পথ ধরেছে বর্তমানে।

এই চেষ্টায় নেপালি জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে সব নেপালি দলকেই দেখা যাচ্ছে একতাবদ্ধ। জাতীয় সংসদের উচ্চ ও নিন্ম পরিষদে সর্বসম্মতিতে সবদল একত্রে নেপাল-প্রেমের শপথে স্বাক্ষর করে ভারতীয় দখল থেকে মুক্ত করেছে স্বদেশের বিস্তীর্ণভূমি। ঐতিহাসিক এই ঘটনায় লিমপিয়াধুর, লিপুলেখ এবং কালাপানিকে নেপালের মানচিত্রে যুক্ত করেছে ক্ষমতাসীন সরকার।

নেপাল জাতীয় সংসদে থাকা দলগুলো হচ্ছে; নেপাল কম্যুনিষ্ট পার্টি (এন সি পি), নেপাল কংগ্রেস (এন সি), সমাজবাদী পার্টি অফ নেপাল (এস পি এন) এবং রাষ্ট্রীয় জনতা পার্টি অফ নেপাল (আর জে পি এন)। দূরদর্শন টিভি ছাড়া ভারতীয় সব চ্যানেলের সম্প্রচার অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে নেপালের ক্যাবল অপারেটরা। ভারতীয় মিডিয়ায় নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ও অবমাননাকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছিলেন সরকারি মুখপাত্র যুবরাজ খাতিওয়াড়া। এর কয়েকঘণ্টা পর থেকেই দেশটিতে ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।

কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, এক সংবাদ সম্মেলনে যুবরাজ খাতিওয়াড়া বলেন, “আমাদের দেশের ভাবমূর্তি, জাতীয়তা ও সার্বভৌমত্বকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য দায়ী ভারতীয় গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সম্পূর্ণ অধিকার সরকারের রয়েছে।” তিনি এ ধরনের সংবাদ প্রচার বন্ধ রাখতে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বানও জানান।

এদিকে, নেপালের শাসক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রঞ্জন ভট্টরাই একটি টুইটবার্তায় বলেন, ‘নয়া মানচিত্র প্রকাশের পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে যে খবর আসছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। আমরা এই মনগড়া এবং ভুয়া রিপোর্টকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছি। সেইসাথে আমাদের সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে নেপালের সরকার এবং মানুষের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে সম্মান জানানোর জন্য ওদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’ এর আগে, ক্ষমতাসীন নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও নেপালের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী নারায়ণ কাজি শ্রেষ্ঠা ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই ছাইপাঁশ বন্ধ হোক।’ এরপর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে ভারতীয় চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার বন্ধ করে দেন ক্যাবল অপারেটররা।

এ প্রসঙ্গে নেপালে বিদেশি চ্যানেলগুলোর ডিস্ট্রিবিউটর মাল্টি-সিস্টেম অপারেটরের (এমএসও) চেয়ারম্যান দিনেশ সুবেদি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘দূরদর্শন ছাড়া আমরা ভারতীয় সব বেসরকারি নিউজ চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ করে দিয়েছি। তারা যেসব খবর সম্প্রচার করেছে, তা নেপালের জাতীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে।এ কারণে এগুলো আর চালানো হবে না।’ নেপালের কেবল অপারেটর মেগা ম্যাক্স টিভি নেটওয়ার্কের সহ-সভাপতি ধ্রুব শর্মা জানিয়েছেন, সরকারের নির্দেশে অনির্দিষ্ট কালের জন্য নেপালে ভারতীয় চ্যানেলের সম্প্রচার বন্ধ থাকবে।

নেপালের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে দেশটির সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী ১৩ জুন সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। এতে নতুন মানচিত্র গ্রহণ করা হয়েছে। যাতে বিতর্কিত লিমপিয়াধুরা -কালাপানি -লিপুলেখ অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ভারত এই এলাকাগুলোকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে আসছে। এই ঘটনায় উভয়দেশের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই নেপালে বন্ধ হলো ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল।

মানচিত্র নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি অভিযোগ করেছিলেন, তাকে ও তার সরকারকে উৎখাতের জন্য ভারতে বৈঠক হচ্ছে। এই বিষয়ে দিল্লি থেকে খবর আসছে। ওলি বলেন, নেপালের ভূখণ্ড চিহ্নিত করায় খুশি হয়নি ভারত।আমাদের জাতীয়তাবাদ এত দুর্বল নয়। আমরা আমাদের মানচিত্র পরিবর্তন করেছি এবং এখন যদি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে গদিচ্যুত করা হয় তাহলে নেপালের কাছে তা কোনো ভাবেই গ্রহণযোগ্য হবে না। ৮ই মার্চ উত্তরাখন্ডের পিথাউড়াগড় লিপুলেখের মধ্যবর্তী সড়কের উদ্ধোধন করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। তারপর থেকেই শুরু এই বিবাদ।

নেপালের দাবি এই ভূখন্ডের মালিক নেপাল। রাস্তা উদ্ভোধনের সময় কাঠমুণ্ডুস্থ ভারতীয় দূতাবাসকে আপত্তির কথা জানিয়ে কূটনৈতিক নোট দিয়েছিলো নেপাল। ভারতীয় দূতাবাস জানিয়ে দেয় এই ভূখন্ড ভারতের। উত্তরাখন্ড থেকে নিপুলেখ পর্যন্ত ৮০ মাইল। ভারতের সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নারাভানে সাফ জানিয়েছেন, ভারত ও নেপালের মধ্যে পারস্পরিক গোলমাল বাঁধানোর চেষ্টা করছে অন্য এক শক্তি।

নেপাল-ভারত বিরোধের সূচনা হয়েছিলো করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়ার পর।এসময় প্রধানমন্ত্রী ওলি সংসদে তার ভাষনে বলেন, “ভারত থেকে অবৈধ প্রবেশকারীদের মাধ্যমেই ভাইরাসটি নেপালে ছড়িয়ে পড়ছে।এজন্যে স্থানীয় কিছু জনপ্রতিনিধি ও দলীয় নেতারা দায়ী,যারা ঠিক মতো পরীক্ষা না করেই তাদেরকে দেশে নিয়ে আসছেন।ভারতীয় ভাইরাসটিকে চীন- ইতালির চেয়ে ভয়ানক মনে হচ্ছে।যে জন্যে মানুষ বেশীহারে সংক্রমিত হচ্ছে”।

রাষ্ট্রপতি বিডি ভান্ডারির উপর থাকা প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রধানমন্ত্রী ওলিকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতিকে অদৃশ্য কেউ নাকি সতর্ক করে দিয়েছে এসব রেষারেষি না করার জন্যে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, চীন-ভারত টানাটানির ফলে গরীব রাজনৈতিক দলনেতাদের লোভ আরো বাড়ছে। ভারতীয় মিডিয়ায় মন্তব্য দেখা গেছে যে চীনের সহায়তায় ওলি ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে মরিয়া হয়ে লড়ছেন। তাই রাজনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতার সুযোগে ভারতীয় পক্ষ থেকে সরকার পতনের আঙ্গুল তৎপর থাকার কথা কেউ উড়িয়ে দিচ্ছেন না।

নেপাল হিমালয় অধ্যুষিত একটি দক্ষিণ এশীয় দেশ যার সাথে উত্তরে চীন এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারতের সীমান্ত রয়েছে। এর শতকরা ৮১ ভাগ জনগণই হিন্দু ধর্মের অনুসারী।বেশ ছোট আয়তনের একটি দেশ হওয়া সত্ত্বেও নেপালের ভূমিরূপ অত্যন্ত বিচিত্র। আর্দ্র আবহাওয়া বিশিষ্ট অঞ্চল, তরাই থেকে শুরু করে সুবিশাল হিমালয় ; সর্বত্রই এই বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। নেপাল এবং চীনের সীমান্ত জুড়ে যে অঞ্চল সেখানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ১০ টি পর্বতের ৮ টিই অবস্থিত। এখানেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট অবস্থিত। এছাড়া এটি বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বৌদ্ধের জন্মস্থান।

চীনাদের মধ্যে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা নেপালের প্রতি আলাদা টান অনুভব করে। বিভিন্ন দেশ থেকে বৌদ্ধের অনুসারীরা নেপালের লুম্বিনি এলাকায় গমন করে থাকেন। যে স্থানটাতে বুদ্ধ পা রেখেছিলেন প্রথম, সেই স্থানটি মায়াদেবি টেম্পল নামেই খ্যাত। লেখক নিজে ঐ স্থান পরিদর্শন করেছেন রাঙ্গামাটির কয়েকজন বাংলাদেশী বৌদ্ধদের সাথে নিয়ে।

Facebook Comments

Hits: 66

SHARE