সর্দারি কম দিন- বেশী দিনের কিন্তু চিরকালের নয়

127

আবু জাফর মাহমুদঃ ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউজে তুলে এনে আমেরিকাকে পৃথিবীর একক অর্থনৈতিক ভান্ডারে রূপান্তর করার পথে বিপদ বাড়ছে নাকি কমছে, তা নিয়ে মুখ খুলেছে ইওরোপীয় ইউনিয়ন। দীর্ঘকাল ধরে আমেরিকাই একক পরাশক্তি এবং দুনিয়ার অর্ধেকের বেশী সম্পদের মালিক একা আমেরিকান কোম্পানীগুলো। এই সম্পদ-শক্তিকে জ্ঞান ও যুক্তির পথে রেখে মাঝারি ও ছোট শক্তি গুলোকে নেতৃত্ব করা প্রশংসনীয়।আর সবাইকে একইসাথে ভয় পাইয়ে দেয়ার কৌশল বন্ধুত্বের পরিবর্তে বিরক্তিই ফলাচ্ছে। সাবধান!

খামখেয়ালি বাড়াবাড়ি যে শত্রুতা বৃদ্ধি ঘটাচ্ছে,আমেরিকার বিশ্ব-জোট খুইয়ে দিচ্ছে। এতে চারিদিক থেকে আমেরিকার মিত্র কমে যাচ্ছে। তাই দাবি উঠছে নভেম্বরের নির্বাচনের আগেই হোয়াইট হাউজ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল উপদেষ্টাদের অধিক পর্যালোচনার। পুঁজিবাদি ব্যবস্থায় মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কামড়া কামড়ি বর্তমান অসন্তোষকে অস্বাভাবিক সংকটে ফেলতে বিশেষ চতুর ইয়াহুদি চক্রের কৌশলবিদরা আবারো বিজয় ধরে রাখবে? নাকি বিশ্বনেতাদের নেতা আমেরিকা পেটের পীড়ায় পথ হারিয়ে নিরুপায় হবে-এই প্রশ্ন প্রাধান্যে এসেছে মনে হচ্ছে।

জয় পরাজয় প্রতিযোগীতায় আছে থাকবে, আমেরিকাকে অতি ভালবাসার নামে আত্নহনন হচ্ছেনা তো? মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসার পর দেশটির প্রেসিডেন্টের স্বেচ্ছাচারী নীতি চরম আকার ধারণ করেছে। ক্ষমতায় আসার পর তিনি মার্কিন লক্ষ্য ও স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে দাবি করেন, তার নীতি বিশ্বে মার্কিন প্রভাব ও ক্ষমতাকে শক্তিশালী করছে। তবে বর্তমান বিশ্ব-পরিস্থিতি ট্রাম্পের ওই দাবির সঙ্গে মেলে না।এব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্ব ও মোড়লিপনার যুগের অবসান হওয়ার কথা উল্লেখ করে চীনের ব্যাপারে শক্তিশালী কৌশলগত নীতি গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞরা বহু আগে থেকেই মার্কিন আধিপত্যের দিন শেষ হয়ে আসার কথা বলে আসছিলেন।

বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি মার্কিন পতনকে আরো তরান্বিত করছে। প্রকৃতপক্ষে, করোনার প্রাদুর্ভাব বিশ্বজুড়ে অভাবনীয় পরিবর্তন এনে দিয়েছে। করোনার কারণে মার্কিন সরকার আর্থ-রাজনৈতিক, সামাজিক ও স্বাস্থ্যখাতে নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে। একারণে করোনার প্রাদুর্ভাব প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শক্তির ভারসাম্যে বিরাট পরিবর্তন এনে দেবে উল্লেখ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান জোসেফ বোরেল বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কোনদিকে যাবে তা স্পষ্ট করার জন্য চাপ ক্রমেই বাড়ছে।গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে জোসেফ বোরেল এটাও স্বীকার করেছেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন বিরোধী শক্তিগুলো নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে যা কিনা ভেতরে ও বাইরে মার্কিন সাম্রাজ্যের পতন ডেকে আনবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুপক্ষীয় বিশ্ব-ব্যবস্থা ভেঙে চুরমার করে দিয়ে মার্কিন নেতৃত্বে একমেরু কেন্দ্রিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সব রকমের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যা ওবামা- কেরী প্রশাসন সহ তারও পূর্বেকার প্রশাসনগুলো করে এসেছে।তবে ট্রাম্প যা চেষ্টা করছেন, তার ফলে বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাব কমে যাচ্ছে, তাদের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং ট্রাম্পের ভুল নীতির কারণে ওয়াশিংটন ক্রমেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একা হয়ে পড়ছে। মিত্রতার আয়তন ছোট হয়ে আসছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা থেকে বেরিয়ে গিয়ে বহুপক্ষীয় আন্তর্জাতিক চুক্তি পদদলিত করেছেন এবং তিনি কেবল মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত।এ র আগে তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকেও বেরিয়ে যাওয়ায় ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন। এ ছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক আরো বহু চুক্তি থেকে বেআইনিভাবে বেরিয়ে গিয়ে বিশ্বকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছেন।

ট্রাম্পের এ নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে চীন ও রাশিয়া। এ কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়কপ্রধান জোসেফ বোরেল বিশ্বে মার্কিন নেতৃত্ব ও মোড়লিপনার যুগের অবসান ঘটতে চলেছে বলে যে মন্তব্য করেছেন,তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আবার একথাও আসছে, চীন-রাশিয়া আমেরিকাকে ওভারটেক করতে পারছেনা,স হ্যও করতে হচ্ছে অনিচ্ছায়। তাই ইওরোপীয় ইউনিয়ন নিজেদের কষ্টের কথা অপর দুঃখীদের সাথে ভাগাভাগি করছে। হয়তো তাই, নতুবা ঠিকই ওরা আগের তূলনায় সমৃদ্ধ হয়েছে।

শক্তির উত্তাপ তো প্রকাশ হতেই হয়। চীন-রাশিয়াই নেতৃত্বও জোর করে টিকে থাকছে, নাগরিকদের মুখে বোবা টেপ আঁটা। ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজে প্রেসিডেণ্ট অনেক ক্ষমতাবান ঠিকই, আমেরিকা তার চেয়ে অতুলনীয় পরাক্রমশালী। একজন অরাজনৈতিক মেধাবি বিজনেস টাইকু্ন বিশ্ব রাজনীতির গতি প্রকৃতির পরিবর্তনে নিজের শ্রেষ্টত্ব চেয়ে রাজকীয় ভাব দেখাতেই পারেন। বাস্তবে তিনি সফল না হলে দুনিয়া যেমন থেমে থাকবেনা। আবার ব্যর্থ না হলেও অবাক হবার নেই। তবে সর্দারি কম দিন অথবা বেশী দিনের হয়, চিরকালের হয়না।

বিশাল পুঁজিপতি ব্যবসায়ীকে পুঁজিবাদী বিশ্ব রাজনীতির কর্ণধার করে পুঁজিবাদী একক বিশ্ব সরকার ব্যবস্থা চালু করার এটা প্রথম পদক্ষেপ। তিনি ব্যর্থ হলেই আমেরিকা ব্যর্থ হয়ে যাবেনা। আমেরিকার হাল ধরে বিজয়ের পতাকা বহন করবে পুঁজিবাদী বিশ্ব রাজনীতিকদের এতোকালের প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রাতিষ্ঠানিকতা থেকেই সৃষ্টি হবে বিশ্বনেতা।কম্যুনিজম বা সাম্যবাদী বিপ্লব রক্ষায় ব্যর্থ চীন এবং রাশিয়া পুঁজিবাদ বিকাশে অবশ্যই অচল, অক্ষম। সাম্যবাদে ব্যর্থ হয়ে ইউনিয়ন হারিয়েছে রাশিয়া। চীন সাম্যবাদীও নেই, পুঁজিবাদী ও হতে পারেনি।

পুঁজিবাদের দাস এসব দেশ এক দৌঁড়ে পুঁজিবাদী বিশ্বনেতা হয়ে সফলতার পতাকা উড়াবে? আমেরিকার মর্যাদার স্থলাভিষিক্ত হবে? মনে হবার যুক্তি তো দেখিনা। ইওরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান আমেরিকা সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, আমেরিকা বনাম ইওরোপীয় ইউনিয়িনের স্বার্থরক্ষার টানাটানির পরিস্থিতি। আমেরিকা নিজের সমৃদ্ধির স্বার্থরক্ষা ঠিক রেখেই দীর্ঘকালের মিত্র আটলান্টিক জোটের মিত্রদেরকেও নিশ্চয় বিকাশে অংশীদার রাখবে।

Facebook Comments

Hits: 54

SHARE