বাংলার ঘরে নতুন শাইলকের আবির্ভাব

126

সা কা ম আনিছুর রহমান খানঃ পবিত্র কোরআন শরীফে সুদ আদান প্রদান হারাম করা হয়েছে । বিদায় হজের ভাষণে মহানবী ( সাঃ আঃ ) বলেছেন , ‘……সাবধান কোন মানুষের প্রতি অত্যাচার করো না! অত্যাচার করো না! অত্যাচার করো না! …আমি তোমাদের কাছে যা রেখে যাচ্ছি দৃঢ়তার সাথে তা অবলম্বন করলে তোমরা কদাটিৎ পথভ্রষ্ট হবে না ; তা হচ্ছে-আল্লাহর কিতাব ও তার রসুলের আদর্শ।…হে লোক সকল ! শয়তান নিরাশ হয়েছে , সে আর কখনও তোমাদের দেশে পূজা পাবে না। কিন্তু সাবধান, অনেক বিষয় তোমরা ক্ষুদ্র মনে করে থাক অথচ শয়তান তারই মধ্যবর্তীতায় অনেক সময় তোমাদিগের সর্বনাশ সাধন করে থাকে।; ঐগুলি সম্বন্ধে খুব সতর্ক থাকবে ’ …সুদ হারাম করা হলো। খাতক শুধু আসল ফেরত দেবে; আর এর শুরু হবে আমার চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল
মুত্তালিব থেকে ।……’।‘ তবুও মুসলমান সমাজে সুদের কারবার চলছে ।

শেক্সপিয়ারের নাটকের কুসিদজীবী শাইলকের কথা শিক্ষিত সমাজ আজো মনে রেখেছে প্রজন্ম পরম্পরায়। সুদসহ ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে না পারলে খাতকের শরীর থেকে গোশত কেটে নেওয়া হবে; এটাই ছিল ঋণদাতার সাথে খাতকের ঋণ আদান-প্রদানের চুক্তি। সময় মতো খাতক ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়। বিষয়টি আদালতে গড়ায়। ঝানু আইনজীবী পরশিয়া বললেন গোশত কেটে নেবেন ঠিক আছে , আমার মক্কেল তা মেনে নিবে কারণ সে এইমর্মে চুক্তিতে আবদ্ধ। তবে গোশত কাটার সময় এক ফোঁটা রক্ত ঝরাতে পারবেন না। চুক্তিতে রক্ত ঝরানোর কথা নাই। মোক্ষম যুক্তি। পরশীয়ার কথা এড়ানোর কোন পথ নাই। তাই চুক্তিটি বাস্তবায়িত হতে পারলো না। নিষ্ফল এক চুক্তির ফলাফল নিয়ে রিক্ত হাতে ফিরে যেতে হলো শাইলককে।

বাংলাদেশে এখনও মহাজনী প্রথা , দাদন প্রথা বিভিন্ন প্রকারে চালু আছে। স্বাধীনতার পর কাবুলীওয়ালারা চলে গেলেও তাদের স্থান পূরণ করে আছে নতুন কাবুলীওয়ালা। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বৃটিশ শাসন আমলে অবিভক্ত বাংলার প্রধান মন্ত্রী থাকাকালে ‘ঋণ শালিশী বোর্ড ‘ প্রতিষ্ঠা করে বাংলার ঋণভারে জর্জরিত প্রজা ও কৃষকদেরকে ঋণভার থেকে মুক্ত করেছিলেন।

১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ববঙ্গ জমিদারী দখল ও প্রজাস্বত্ব আইন (১৯৫১খ্রিষ্টাব্দের আইন নং ২৮) কার্যকর হলেও জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয়েছে বটে কিন্তু জোতদারী শোষণ বন্ধ হয়নি।জমির ব্যক্তিগত মালিকানার সর্বোচ্চসীমা এবং সমুদ্রে জাগা চরের মালিকানা সংক্রান্ত বিষয়ে ধণিক বণিক প্রভাবশালী কায়েমী স্বার্থবাদী মহলের অধিপত্য ও প্রভাব প্রতিপত্তি এখনও সদম্ভে বিরাজমান। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ক্ষুদ্র ঋণদাতার নামে ‘বেসরকারী সংস্থা‘ ( এন জি ও )। এসব সংস্থা ব্যাংকের কাছ থেকে সুদে ঋণ নিচ্ছে এবং তা ক্ষুদ্রঋণ নামে গরিব মানুষের মাঝে বিতরণ করছে। তাদের কাছ থেকে সুদ নেওয়া হচ্ছে প্রায় ২৮% হারে। [ কখনো কখনো , কোথায়ও কোথায়ও , সুযোগ বুঝে তারও বেশী ]।

গরিবেরা যখন তা পরিশোধ করতে পারছেনা ; তখন তাদের উপর পুলিশ চড়াও হচ্ছে, ব্যক্তিগত অনুরোধে , পিটুনি দেওয়া হচ্ছে। ঋণদানের সময় খাতকের কাছ থেকে দস্তখত করিয়ে রাখা ব্যাংকের চেক ব্যবহার করে আদালতে মামলা করা হচ্ছে। এভাবে এনজিওদের হাতে গরিব জনগণ শোষিত ও নির্যাতিত হচ্ছে বলে ব্যাপক অভিযোগ আসছে প্রতিনিয়ত, অভিযোগ আসছে সুদের টাকা আদায় করার জন্য কিছু কিছু এন জি ও গুন্ডা বাহিনী লালন করছে এবং পুলিশের সাথেও গড়ে তুলছে সখ্যতা। গরিবের রক্ত চুষে সুদ আদায় করে এ সকল সংস্থা অঢেল সম্পদের মালিকানা অর্জন করছে, এরপর নিজ প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নিজেরাই আত্মসাৎ করছে বিভিন্ন কেনা কাটায় ‘ভূয়া‘ ভাউচার ব্যবহার করে। অনেক ক্ষেত্রেই অস্থিত্বহীন দোকানের নাম ব্যবহার করে তৈরী করা হচ্ছে এসব ভাউচার।

‘ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ‘ ( এম আর এ ) , ‘পল্লী-কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন‘ ( পি কে এস এফ ) সহ বেশ কিছু সংস্থা এসব বিষয়ে ‘বে-সরকারী সংস্থা‘ সমূহের কর্মকান্ড দেখভাল করে থাকেন। এসব কর্তৃপক্ষ ও ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই সততা ও নিয়মনিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। তারা তাদের ‘পরিদর্শন‘ ও ‘নিরীক্ষা‘ প্রতিবেদনে অনেক সময়ই এসব অনিয়ম ,অসততা এবং সংস্থার কর্মকর্তাদের অযোগ্যতা ও দুর্নীতির বিষয়ে সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায়। সেই সাথে আরো জানা যায় যে এই সব প্রতিবেদন আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ফাউন্ডেশন যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই । যার কারণে এইসব বে-সরকারী সংস্থা থেকে দ্ররিদ্র জনগোষ্ঠির জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে কোন উন্নতি হয়নি৤ তবে সংস্থার কর্মকর্তাদের শনৈ শনৈ উন্নতি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কর্মী ও সহায়ক কর্মীগণ সময়সূচীর তোয়াক্কা না করে কাজ করে গেলেও তাদের ভাগ্যের কোনই ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি।

এইসব সংস্থাগুলো বিদেশী অনুদানের অর্থে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে। এখানেও আর্থিক সততার অভাব ও ভাউচার নিয়ে অনিয়মের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের কারণে কালো তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরাও পুনরায় প্রকল্প পরিচালনার জন্য বিদেশী অনুদানের অর্থ বরাদ্দ পেয়েছেন বলে রটনা রয়েছে। এটা পাবার জন্য মূল কর্তৃত্ব নিজের হাতে রেখে বরাদ্দ পাবার জন্য নিকট স্বজনদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। এ জন্য আবার ‘লবিষ্ট‘ নিয়োগ করে থাকে তারা। এইসব ‘লবিষ্ট‘গণ উল্লিখিত সংস্থাগুলোতে ‘প্রশিক্ষক‘ হিসাবে কাজ করেন এবং অস্বাভাবিক ও বহুগুণ বেশী পারিশ্রমিক গ্রহণ করে থাকেন। বিনিময়ে তারা বিদেশী অনুদানের অর্থ উক্ত সংস্থাগুলোকে পাইয়ে দেবার জন্য তৎপর হন। বাধা আসতে পারে এরূপ তথ্য কৌশলে গোপন করেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা সফল হন। এর ফলে বিদেশীগণ কর্তৃক দেশের দরিদ্র , হত দরিদ্র মানুষের জন্য যে অর্থ এ দেশে পাঠান তা উক্ত মানবগোষ্ঠির কোন কাজে লাগে না। কুসিদজীবী সংস্থাগুলোর উপর পর্যায়ের কতিপয় ব্যক্তি আত্মসাৎ করে নিজেদের ভাগ্য গড়ে নেয়। কিন্তু শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী জনগণ এসব সংস্থা থেকে কোনভাবেই উপকৃত হন না।

এইসব সংস্থাগুলো আবার বিভিন্ন ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়ে থাকে। তা নিতে গিয়ে অনেক সময়ই তারা জমি বা স্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রাখে। একই সম্পত্তি একাধিক ব্যাংকের কাছেও বন্ধক রাখা হয়, স্বত্ব অর্জন সম্পর্কিত তথ্য গোপন করে। দলিল জমা দেবার সময় কৌশল অবলম্বন করা হয়। নিঃস্বত্ববান ব্যক্তির কাছ থেকে দলিল করে নিয়েও এটা করা হয়। যেমন নাবালকের সম্পত্তি তার মা এর কাছ থেকে ক্রয় করার দলিল। ‘অভিভাবক ও প্রতিপাল্য‘ আইন ( গার্জিয়ান এন্ড ওয়ার্ডস এ্যাক্ট ) অনুসারে এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতের অনুমতি ছাড়াই এটা করা হয় ।

এভাবেই কতিপয় ‘বে-সরকারী সংস্থা‘ অবাধে বিধি বিধান উপেক্ষা করে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের কর্মতৎপরতা। ক্ষতিগ্রস্থ , বঞ্চিত, শোষিত, নিষ্পেষিত হচ্ছে শ্রমজীবী , কর্মজীবী , পেশাজীবী জনগণ । সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, অন্যান্য তফসিলি ব্যাংক এবং জনগণকে এর প্রতিরোধ ও প্রতিবিধানের জন্য এগিয়ে আসতে হবে। ধোপ দুরস্ত সাদা পোষাক পরা এই সব নব্য শাইলকদের খপ্পর থেকে জনগণকে মুক্ত করতে হতে হবে সবাইকে দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ ।

লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ এবং বর্তমানে অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

Facebook Comments

Hits: 53

SHARE