হাজার বছর পর বাংলা এখন আর্যদের

159

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ সেই ১৯৭১ এর কথিত স্বাধীনতার পরেও যে আবাস ভূমিটি ছিল আমার পিতৃ ভূমি, সেই ভুমিতে আজ পা ফেলতেও ভয় লাগে। যে ভুমিতে ধুলো বালি কাদা মাটিতে গড়াগড়ি করে, নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে এপার ওপার করেছি, সেই নদী আর মাঠের ছবির দিকে তাকাতেও আজ ভয় লাগে।

ভোরের সুমধুর আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙ্গার পড়ে নামাজ না পড়লেও হয়তো বেরিয়ে পরতাম দৌড়াতে। শীতের সময়ে বিভিন্ন এলাকায় ওয়াজ মাহফিলে বা তাফসীর মাহফিলের মাইকে সুমধুর কোরআন শরীফের তেলাওয়াত শুনলেই ঘুম চলে আসতো। স্কুলে সবচেয়ে কম ভয় পেতাম ধর্ম শিক্ষার হুজুরকে কিন্তু পরীক্ষার আগেই এই হুজুরের কাছে ধর্না দিতাম ইসলামিয়াত পাশের সহজ পাঠ নিতে। আরও ছোট বেলায় মসজিদে যেতাম আমপারা- ছেপারা পড়তে। নীতি ও আকিদা শিক্ষা নিতে, নামাজ শিক্ষা নিতে।

বিভিন্ন উপলক্ষে ঘরে ঘরে মিলাদ বা কোরআন খতম দেয়া হলে দোয়া ও খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হতো। জুম্মার নামাজ ছিল উৎসবের মত। আমাদের বাপ চাচাদের আয়ের অংশ হয় গরীব বা মসজিদ মাদ্রাসার লিল্লাহ বোর্ডিঙয়ের আবাসিক ছাত্রদের উন্নয়নে দান করা হতো। ঈদে আমরা আমাদের আনন্দের ঢেউকে ছড়িয়ে দিতাম ধর্মীয় আবহের মধ্য দিয়ে যেখানে নামাজ ও কোরবানি ছিল প্রধান উপলক্ষ্য। এই হলো আমার পিতৃভূমি বাংলাদেশে আমার দেখা চিত্র।

বাংলাদেশ আমার পিতৃভূমি। পিতাই হলো আদি। আমার মায়েরও প্রিয় মানুষ হলেন তাঁর পিতা। তাই এটিকে মাতৃভূমি না বলে পিতৃভূমি বলায় রাজনীতি করে লাভ নেই। আর্য- ব্রাহ্মণদের বানানো মাতৃদেবীর পূজা চর্চার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠা সংস্কৃতি বা সাহিত্যে আমার বিশ্বাস বা ভক্তি নেই বলেই আমি পিতৃতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী। তবে এই বিশ্বাসের মানে এই নয় যে আমার মাতৃ ভক্তি নেই। আমার এই কথাগুলোর একটু বিশ্লেষণ করলেই আমাদের আজকের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়ের সুত্র পেয়ে যাবেন। তবে সতর্ক বার্তা রইল যে বেকুবেরা এটি নিয়ে খামাখা সময় নষ্ট করবেন না।

আমরা যারা অর্ধশত বা চল্লিশোর্ধ বয়সকালকে পার করেছি, যারা গ্রাম বাংলায় জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছি তাদের দেখা সেই চিরচেনা দেশটি আর নেই। যারা শহরের অভিজাত বা সংরক্ষিত স্থানে জন্ম নিয়েছেন বা বেড়ে উঠেছেন বা অবৈধ আয়কারী পিতার সন্তান তাদের এই গ্রামীণ সমাজ- সংস্কৃতি বা মানুষের আদর্শিক ও নীতিবোধের সাবেক ও বর্তমান অবস্থান ও পার্থক্য অনুভব করারও শক্তি নেই বলেই আমি বিশ্বাস করি। আমরা যারা অনুভব করি তারা আবার এতোটাই সাহসী যে আমাদের পক্ষে এই পার্থক্য ঘুচানোর কোন চেষ্টা নেয়াতো দুরের কথা এটা প্রকাশ্যে বলতেও ভীত থাকি। আর যারা বঝেই না তাদের হাতে নেতৃত্ব কর্তৃত্ব থাকলেও তাদের দ্বারা এই পার্থক্য বৃদ্ধি হওয়া ছাড়া ঘুচানোর কোন সম্ভাবনা আদৌ নেই।

কেন আজকের বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতির এই অসাঞ্জস্য বিবর্তন যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে যোজন যোজন দুরের কোন গ্রহের বাসিন্দারের মত করে দিয়েছে। আমরা এ নিয়ে কোথায়ও বলি না। আগে হাজার হাজার শিক্ষিত কমিউনিস্ট নাস্তিক থাকলেও সামাজিক নৈরাজ্য ছিল না। কিন্তু কেন আজ লাখ লাখ ধর্ম বিদ্বেষী নাস্তিক (মূর্খ নাস্তিকও এখন অনেক) পয়দা হয়েছে যারা সামাজিক নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে অবিরত? এটা নিয়ে গবেষণা করার প্রশ্নই আসে না। সবাই আমরা রাষ্ট্র ক্ষমতার পরিবর্তন আর নির্বাচন নিয়েই ব্যস্ত। যদিও সেখানেও পলিসি অদৃশ্য, মানুষের সমস্যা অদৃশ্য। নীতি বা কারন বা সংগঠন সেখানে গৌণ, মুখ্য কেবল নেতা বা নেত্রী বা গোষ্ঠী স্বার্থ। আসুন আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন নিয়ে কিছুটা খোঁজার চেষ্টা করি।

আজকাল পাকিস্তান বিরোধিতার কালচার ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে। ধর্মের পক্ষে কথা বললে, আর্য- ব্রাহ্মণদের অপকর্মের বিরুদ্ধে এবং আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বললেই পাকিস্তানের দালাল, রাজাকার আখ্যা আইনি ও রাষ্ট্রীয় ভাবেও দেয়া হয়। কিন্তু একবারও কি আমরা বলি আজকে যারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এতো সোচ্চার তাদের বাপ দাদারাই এই পাকিস্তান বানিয়ে রেখে গিয়েছিলেন। পাকিস্তান যদি খারাপ হয় তবে এই কুকর্মটি তাদের বাপ দাদারা আমাদের কাধের উপর উঠিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি আজকে যারা কথিত স্বাধীনতার (আমি মনে করি জাতি এখনো পরাধীন) তথাকথিত বিভিন্ন টাইটেল লাগানো বড় বড় নেতা যাদের স্মরণ করতে বাদ্য বাজনা দিয়ে পূজা দিয়ে তাদের নামে প্রতি বছর বেহুশ হয়ে রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো; সেই তারা কি এই পাকিস্তান বানানোর জন্য দায়ী নন? কই তাদেরকে তো একবারও কেউ দোষারোপ করেন না? অথচ সত্য হল পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভোটেই পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। আর পূর্ব পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য সংগঠন মুসলিম লীগও এই পূর্ব পাকিস্তানে গঠন হয়। যারা সেদিন পাকিস্তান বানিয়েছিলেন সেদিন কি তারা ভুল করেছিলেন? সেটির মিমাংসা হোক আগে।

পাকিস্তান সৃষ্টির সময় আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ কেমন ছিল? সেটি নিয়ে কথা আজকের। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হবে পরবর্তীতে। সে সময়ে পরিবারগুলোর বিন্যাস ছিল কেমন? পরিবারগুলোর ভেতর আদব লেহাজ কেমন ছিল? মানুষ মানুষকে কতটুকু প্রতারিত করতো? কেমন করে একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করতো?

হ্যাঁ তখনও মানুষ অন্যায়ের শিকার হতো তবে সেটি হতো ক্ষমতাবান গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে গরীবেরা। কিন্তু বিচার ছিল। শালিশ ব্যবস্থা ছিল। ইচ্ছে করলেই আজকের মত যা খুশী তা সমাজে সবাই করতে পারত না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ সংগঠিত হতে পারতো। আর পারতো বলেই মুক্তিযুদ্ধের জন্য সংগঠিত হতে পেরেছিল ১৯৬৭-৬৮ থেকেই। অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেকোন যুদ্ধ সংগঠন যেমন এখন আর সম্ভব নয়। যদিও এই পূর্ব বাংলা আর্য- ব্রাহ্মণদের কাছে হাজার বছর ধরেই পরিচিত ছিল ম্লেচ্ছ বা যবনদের ভূমি। যে ভুমিতে আমাদের পূর্ব পুরুষেরা বাস করতেন ফসল ফলাতেন। 

আজ আমাদের এই পিতৃভূমি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক এবং আধ্যাত্মিকভাবে কতখানি আমাদের দখলে অবশ্যই তা বিশ্লেষণের দাবী রাখে; নইলে নতুন প্রজন্মের সাথে প্রতারনা করা হবে। (পুরনো লেখা সম্পাদিত)

লেখকঃ রাজনীতিক এবং আইন ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

Facebook Comments

Hits: 81

SHARE