স্বাধীনতার ধরণ নিয়ে সংক্ষিপ্ত কথা

110

রেজাউল করিম রনিঃ

ক.
ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিন ভারতের স্বাধীনতার ৭০ বছর উপলক্ষে বিশেষ লেখা-লেখি নিয়ে একটা সংখ্যা প্রকাশ করেছে গত বছর। বাসে আসতে আসতে একটা লেখার উপর চোখ রাখছিলাম। আমার পছন্দের সমাজ তাত্বিকদের একজন- গোপাল গুরু। আগেও তাঁর লেখা-লেখি দেখেছি। তার সব বই গত বারই দিল্লী থেকে নিয়ে এসেছিলাম।

চলতি সমস্যা নিয়ে দার্শনিক আলাপের দক্ষতা খুব বেশি চিন্তকের থাকে না। গোপাল মজার এবং বাস্তব প্রবণতার তাত্বিক দিক নিয়ে কথা বলেছেন- স্বাধীনতা প্রসঙ্গে। এটা বাংলাদেশের জন্যও লাগসই। তিনি বলছেন, ‘স্বাধীনতা’ কথাটার গুরুত্ব এবং অর্থ একটি জাতীর জিবনে সব সময় একই অর্থ/মিনিং নিয়ে টিকে থাকে না। ‘স্বাধীনতা’ র সিগনিফিকেন্স চেঞ্জ হয়। যেমন, উপনিবেশ থেকে মুক্তির সংগ্রামের কালে ‘স্বাধীন’ হওয়াটাই প্রধান লক্ষ্য ছিল। উপনিবেশ বা অপরের শাসন থেকে মুক্তিই ‘স্বাধীনতা’ -এমন ধারণা তখন প্রধান থাকে। কিন্তু মুক্তির পরে? দেশ অপরের শাসন থেকে মুক্তি লাভের পরে, স্বাধীনতা বলতে যেটা বুঝায় তা হল, “রাজনৈতিক স্বাধীনতা।”

এই রাজনৈতিক স্বাধীনতাই আসলে স্বাধীনতার মূল সিগনিফিকেন্সে পরিণত হয় -জাতীর জিবনে। এবং তিনি আরও যোগ করেন, এই রাজনৈতিক স্বাধীনতাই দেশ গঠনের হরেক রকম পরিভাষা জনগনের মধ্যে তৈরি করে। আর এই সব পরিভাষার ‘রেটরিক্যাল’ বা বাক্যস্বর্বশ্ব ব্যবহার দেখা যায় ক্ষমতাসীনদের মাঝে। যেমন, মেইক ইন্ডয়া ( আপনরা পড়ুন- ডিজিটাল বাংলাদেশ – নির্মান)।

(দলিত: ইন এ স্ট্যাইট অব আন-ফ্রিডম-গোপাল গুরু, পৃষ্ঠা-৭৩, ফ্রন্টলাইন। হুবহু আক্ষরিক অনুবাদ না করে সংক্ষেপে লেখাটার রিডিংটা দেয়া চেষ্টা করা হয়েছে)

খ.
এখন আমাদের অবস্থা দেখেন। ‘স্বাধীনতা’ বলতে আমরা যা বুঝি! যেই চিন্তার কাঠামোতে আমারা ‘স্বাধীনতা’ বিষয়টা বিচার করি তা অতি পশ্চাতপদ। আমরা সেই ৭১ সালের জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের অতি প্রাথমিক উত্তেজনার মধ্যে আটকে আছি এখনও। ফলে শুরু থেকেই আমরা স্বাধীনতাহীন একটি জাতী হিসেবে বেড়ে উঠছি। বরং ৭১ এর গরমের উপর ভর করে প্রথম যিনি বাংলাদেশের ক্ষমতা নিলেন তিনি শুরুতেই হরণ করলেন জনগনের ‘রাজনৈতিক স্বাধীনতা’। যার চুড়ান্ত রুপ দেখা গেছিল, বাকশালে।

এর পরে আমরা রাজনৈতিক ভাবে স্বাধীন হওয়ার জন্য যে সংগ্রাম ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তার কোন কার্যকর পরিবেশ তৈরি করতে পারি নাই। এরই ধারাবাহিকতায় আজকে বাংলাদেশে কোন “রাজনৈতিক স্বাধীনতা” নাই। আওয়ামী লীগ হুট করে আজকে এমন বেশরম হয় নাই। এর ইতিহাস জাতীর জন্মের সাথেই জড়িত। আমরা আমাদের ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করে ৭১ এর আবেগে পূজা দিছি। যা ফ্যাসিবাদি ইমোশন তৈরি করেছে। যা কোন ভাবেই যুক্তিযুদ্ধের ধারে কাছে নাই। শাহবাগি পয়দা হইছে দলে দলে। আর যে দেশে “রাজনৈতিক স্বাধীনতা” থাকে না সেই দেশে আর কোন ধরণের স্বাধীনতারই কোন মূল্য থাকে না। আমাদের দেশেও নাই। স্বাধীনতার নামে এক হাস্যকর চেতনার জোকারি বা বাকোয়াজি শোনা যায় মাত্র। এটা বেশি বেশি বলার মধ্য দিয়ে আসলে গোটা জাতীকে রাজনৈতিক ভাবে আরও পরাধীন করে রাখার চেষ্টা করা হয়। অশিক্ষিত বুদ্ধিজিবিরা এগুলা নিয়ে ক্রিটিক্যালি কথা না বলে দলীয় বয়ানের ক্যানভাসার হয়ে ওঠে -তখন এটা আরও সমস্যা তৈরি করে।

৭১ এর মুক্তির লড়াইয়ের ইভেন্ট থেকে ‘স্বাধীনতা’কে আলাদা করে দেখবার চোখই তৈরি হয় নাই আমাদের। লম্বা আলাপ বাদ দেই, এক কথায় বললে, জাতী হিসেবে আমরা পরাধীন। এই সত্য মেনে নিলে অন্তত স্বাধীনতা নিয়ে ভাবা-ভাবির কাজটা শুরু হবে।

Facebook Comments

Hits: 35

SHARE