এরশাদকে নিয়ে মিথ্যা বলবেন না

212

রেজাউল করিম রনিঃ আমাদের দেশে রেওয়াজ হল- কেউ মরে গেলে বলতে হয়, আহ লোকটা ভাল ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে ‘এরশাদ’ – কি একটা নাম। না কি গুণবাচক পদবী। মিরজাফর যেমন মিথ্যার সমনামি।  এরশাদ আর স্বৈরাচার, ভন্ড, পল্টিবাজ একই। ফলে এরশাদ কেবল একটি নাম নয়, এটা গুণবাচক শব্দে পরিণত হয়েছে।

তারপরেও অনেক মানুষ উনার প্রসংশা করছেন। এর কি কারণ থাকতে পারে? কয়েটা বলা যাক…

এরশাদ যা করছেন, এখনকার প্রজন্ম জানে না। আর যারা জানেন, তাদের একটা বড় অংশই চেতনাগত ভাবে বামবাদি। এরা লীগকে বিকল্প হিসেবে মানতে পারেন কিন্তু এরশাদকে গালি দিবে স্বৈরাচার বলে।

ফলে তাদের এই হাওয়াই পজিশন থেকে এরশাদের প্রতি প্রচন্ড গালিগালাজ লোকদের মধ্যে উনার ব্যাপারে সিম্পেথি তৈরি করেছে। কারণ যারা গালি দিচ্ছে তারা তো বড় ষ্বৈরাচারের পক্ষে। এরশাদ তো সে তুলনায় অনেক ছোট স্বৈরাচার। ফলে একটু সহানুভূতি তিনি পেতেই পারেন।

এখন যে ফ্যাসিবাদ, যে অরাজকতা চলছে সেই হিসেবে এরশাদের আমল ছিল দুধ-ভাত। কাজেই এই বিষে ভরা চেতনার জুলুমই যখন আমাদের দেশের মানুষের সয়ে গেছে ,এরশাদকে আর কত বড় স্বৈরাচার ভাববে সে?

অন্যদিকে আমাদের দেশের মানুষের নৈতিকতা মোটাদাগে দাস্য-নৈতিকতা। এরা কথায় কথায় অবাক হয়। এরা যে কোন ধরণের ক্ষমতা, ভেল্কি, পারফর্ম দেখে ভক্তিতে গদগদ হয়। নিজের পক্ষে গেলেই বা নিজের আরামের জন্য খুব নীতিবাদি হয়ে যায়। নিজের পক্ষে না গেলে সব অন্যায় করার সামর্থও সে রাখে।

ফলে মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে অনেকে এরশাদ নিয়ে স্তুতি গাইছেন। অনেকে লোকদেখানো উন্নয়ণের গপ্পে আস্থা রেখে এরশাদকে নিয়ে শোক করছেন।

‘মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়’ – এই কথাটার খুব ভাল নজির এরশাদ। কিন্তু সেই বদলটা হয়েছে সব সময় দেশের ১২টা বাজিয়ে।

জিয়া হত্যা নিয়ে অনেকেই তাঁকে সন্দেহ করেন। জিয়াকে হত্যার জন্য মঞ্জুকে দায়ি করা হয়। তিনি জিয়ার প্রতি বিরক্ত ছিলেন, কিন্তু তাঁকে হত্যা করা তো দূরের কথা কোন ক্ষতির কথাও ভাবতে পারতেন না। এক সাথে যুদ্ধ করেছেন। 

তিনি জানতেন যে এরশাদ তাঁকে হত্যা করতে পারে তাই তিনি পুলিশের কাছে ধরা দিয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন বিচারে তাঁর দোষ প্রমাণিত হলে তিনি শাস্তি মেনে নিবেন। কিন্তু এরশাদ কিছু সেনা পাঠিয়ে তাকে পুলিশের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে আসে এবং ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে। তিনি অনেক বড় যোদ্ধা ছিলেন। ছিলেন দেশ প্রেমিক।

যা হোক ভারতে গিয়ে এরশাদ বড় বড় কবিতার আসর করত প্রায়ই। দিল্লীর চিন্তকরা আমাকে বলেছেন, এরশাদ কবিতা পড়তেন। লোকজন ভাবত এতো শিল্পমনা একজন শাসক খারাপ হতেই পারে না। ভারতের বুদ্ধিজিবীকূলকে তিনি শিল্প চর্চা করে প্রতারিত করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজিবীদের প্রতিবাদ কমই ছিল সেই সময়।  আর ভারতের কাছে তাঁর মর্যাদা ছিল একটা বিশ্বস্ত কুকুরের মত। 

সর্বশেষ বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদকে বহাল তবিয়তে প্রতিষ্ঠিত করে তিনি একজন প্রকৃত স্বৈরশাসকের মতই কবরে গেলেন।

অনেক স্বৈরশাসক মরে যাওয়ার সাথে সাথে স্বৈরতন্ত্রের বিনাশ হয়। কিন্তু উনার ভাগ্য এতই ভাল যে উনার আমলের চেয়ে শতগুন শক্ত স্বৈরতন্ত্রের পোক্ত ভিত জিন্দা রেখে তিনি কবরে যেতে পারলেন। এটা দুনিয়াতে ইউনিক। 

উনার বিচারের ভার সৃষ্টিকর্তার হাতে। কিন্তু উনার কর্ম বাংলাদেশেকে আজ যে জায়গায় দাঁড় করিয়েছে তার জন্য উনার প্রসংশা করাটা আর একটা মিথ্যচারিতা। মৃত ব্যাক্তি নিয়ে নিশ্চয়ই মিথ্যা বলা ঠিক না। 

তবে আল্লাহ মহান। উনাকে ক্ষমা করার মালিক তিনিই।

লেখকঃ সম্পাদক, জবান

Facebook Comments

Hits: 74

SHARE