জেনারেল এরশাদের ইন্তেকালঃ বিএনপি আ’লিগের শোক

81

শেখনিউজ রিপোর্টঃ সাবেক রাষ্ট্রপতি লে জেনারেল (অব) হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ রোববার সকাল পৌনে ৮ টায় ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)। বিগত ১০ দিন ধরেই তিনি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

৯০ বছর বয়সী এরশাদ রক্তের ক্যান্সার মাইডোলিসপ্লাস্টিক সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিলেন; শেষ দিকে তার ফুসফুসে দেখা দিয়েছিল সংক্রমণ, কিডনিও কাজ করছিল না। মৃত্যুকালে স্ত্রী রওশন এরশাদ, তার ছেলে রাহগির আল মাহি এরশাদও (শাদ এরশাদ) ছিলেন সিএমএইচে। এরশাদ-বিদিশার ছেলে শাহতা জারাব এরিক (এরিক এরশাদ) বাবার বারিধারার বাড়ি প্রেসিডেন্ট পার্ক থেকে হাসপাতালে ছুটে আসেন।

জাতীয় পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের, দলের মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাঁ, সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমীন হাওলাদারসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতা ও  স্বজন এবং আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল-আলম হানিফ ছিলেন হাসপাতালে।

রোববার দুপুরেই ঢাকা সেনানিবাসে সেনা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে সাবেক সেনাপ্রধান এরশাদের প্রথম জানাজা হয়। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, সাবেক সেনাপ্রধান আবু বেলাল মোহাম্মদ শফিউল হক, সাবেক সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম এই জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।

জানাজার এক ঘণ্টা আগে জাতীয় পতাকা ও সেনাবাহিনীর পতাকা মোড়ানো এরশাদের কফিন মসজিদ প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়। সেখানে ভাইয়ের জন্য সবার দোয়া চান জি এম কাদের, কোনো ভুল করে থাকলে তার জন্য ক্ষমাও চান তিনি।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গাঁ সাংবাদিকদের জানান, সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বিরোধীদলীয় নেতা এরশাদের জানাজা হবে। এরপর বেলা ১২টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত মরদেহ রাখা হবে কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। বিকালে বায়তুল মোকাররমে হবে আরেকটি জানাজা।

বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে মঙ্গলবার সকালে মরদেহ নেওয়া হবে এরশাদের পৈত্রিক নিবাস রংপুরে। সেখানে জেলা ঈদগাহ মাঠে হবে চতুর্থ জানাজা। এরপর ঢাকায় ফিরিয়ে এনে দাফন করা হবে সাবেক এই রাষ্ট্রপতিকে। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে সেনা কবরস্থানে এরশাদের দাফনের কথা তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হলেও দলটির রংপুরের নেতারা চাইছেন সেখানে তাদের নেতার সমাধি। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাঙ্গাঁ বলেছেন, দাফনের বিষয়ে পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বুধবার বাদ আছর গুলশানের আজাদ মসজিদে এরশাদের কুলখানি হবে বলে জানানো হয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ; শোক বার্তায় তিনি প্রয়াতের পরিবারের প্রতি সমবেদনাও প্রকাশ করেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা শোকবার্তায় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে এরশাদের ‘গঠনমূলক ভূমিকা’ স্মরণ করেছেন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার দেয়া শোক বার্তায় এরশাদের বিদেহি আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

সাবেক সেনাপ্রধান এরশাদের জন্ম ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারের দিনহাটায়। অবিভক্ত ভারতে শিশুকাল কুচবিহারে কাটে তার। ভারত ভাগের পর তার পরিবার চলে আসে রংপুরে; পেয়ারা ডাকনামে পরিচিত এরশাদের কলেজের পড়াশোনা চলে রংপুরেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এরশাদ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় পশ্চিম পাকিস্তানেই ছিলেন এরশাদ। তার ভাষ্য, তিনি বন্দি হিসেবে সেখানে ছিলেন।  ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে ফেরার পর  সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হন তিনি।

১৯৭৫ সালে এরশাদ ভারতের ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে প্রতিরক্ষা কোর্সে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। ওই বছরের ১৫ অগাস্ট রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সেখানেই ছিলেন।

জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হওয়ার পর এরশাদকে করা হয় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান, মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে। জিয়া রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে ‘নির্বিষ’ এরশাদকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে সেনাপ্রধান করেন।

১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে যে ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়া নিহত হন, তার পেছনে এরশাদই কলকাঠি নেড়েছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এমনকি জেনারেল মনজুর হত্যায়ও এরশাদ জড়িত বলেই এখনও ধারনা বিদ্যমান।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। নিজেকে সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে সামরিক শাসন জারি করেন তিনি, স্থগিত করেন সংবিধান।

প্রথমে বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসিয়েছিলেন এরশাদ। কিন্তু সব ক্ষমতা ছিল এরশাদেরই হাতে, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এরশাদের অনুমোদন ছাড়া কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ ছিল না আহসানউদ্দিনের।তার এক বছর পর আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন এরশাদ। সেই থেকে দেশের রাজনীতিতে অগনতান্ত্রিকতার শুরু। যা আজো জাতিকে রক্ত দিয়ে বহন করতে হচ্ছে।

তবে স্মরনযোগ্য যে জেনারেল এরশাদের শাসনামলেই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড কম হয়েছে এবং সাধারন নাগরিকদের হয়রানি হতে হয়েছে একেবারেই উপেক্ষা করার মত।

 

Facebook Comments

Hits: 32

SHARE