কেমন আছে এখনকার বাংলাদেশ…?

287

রেজাউল করিম রনিঃ  এই ধরণের কন্ডিশনে পাবলিকের অবস্থা কি রকম হয়? এটা কি আমরা ভেবে দেখেছি? প্রথমতো কিছু বুঝে উঠতে পারে না আম-জনতা। বাস্তবতা ও মিডিয়ার উপস্থাপিত বাস্তবতার ভিতর পাবলিক নিজেদের বুঝকেই সন্দেহ করতে থাকে। এবং সবকিছু দেখে-শুনে এতোটাই অবাক বা বিষ্মত হয় যে কি নিয়ে কথা বলবে বা কথা বলে, প্রতিবাদ করেই বা কি হবে এমন একটা মনোভাব জন্ম নেয়। কারণ, বুদ্ধিজিবিরা, লেখকরা বা তারকারা বা জনগনের বিশেষ করে মধ্যবিত্তের আইডলরা এই ফ্যাসিবাদের গুনগান শুধু না এটাকেই জাতীয় মুক্তির পথ বলে প্রচার করছে।

ধরেন, সংসদে আজকেও জনগনকে ধন্যবাদ দেয়া হয়েছে, ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করার জন্য( শেখ হাসিনা বলেছে)। ইসি খুব সহজ ভাবে নানান কথা বলে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের আইন ও বিচার বিভাগগুলো আইনের পোষাকেই সব অন্যায়কে বৈধ বলে চালিয়ে দিচ্ছে। ভিসি খুশির সাথে নাচতে নাচতে কথা বলছে মিডিয়ার সামনে। সুষ্ঠ নির্বাচনের ইতিহাস নাকি পয়দা হয়েছে ভোট ডাকাতির পরেও।

রাজনৈতিক নেতা-পাতি নেতারা এমন কথা বলছে যাতে দুঃখের মধ্যেও মানুষ খিল খিল করে হাসতেছে। ফেসবুকে প্রচন্ড কৌতুক ও বিপ্লব চলছে। মানুষ দেখছে তাদের চারপাশের অনেক লোকই এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী কাজের সাথে আছে। বিপুল লোক এই সরকারকে বিশ্বাস করে। নাহ, কথাটা ঠিক হল না। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ কবে নিপাত যাবে কেউ জানে না। এই অন্যায় শাসন চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে জনগন এই সকারের উপর আস্থা রাখতে শুরু করেছে ইতমধ্যে। আর এইটাকে বলে, ‘Faith Without Belief’। আওয়ামী লীগকে জনগনতো দূরের কথা আওয়ামী লীগের নেতা কর্মিরাও বিশ্বাস করে না। কিন্তু ‘আস্থা’ রাখে। লুট-পাটের জন্য, কিছু সুবিধার জন্য, কেউ প্রাণের ভয়ে আস্থা রাখে। এটা অনেকদিন চলতে চলতে আর খুব একটা অস্বাভাবিক মনে হয় না এখন। এটাকে বিখ্যাত চিন্তক।

আমার সিনিয়র বন্ধু জিয়াউদ্দিন সরদার নাম দিছেন, ‘পোস্ট-নর্মাল’ কন্ডিশন। এই ফ্যাসিবাদ যেহেতু সংবিধান, ভোট,গণতন্ত্র, ৭১ এর চেতনা, সেকুলারিজম, ধর্ম, মদিনা সনদ, হেফাজত সবই ধারণ করেই টিকে আছে। এবং সমস্ত কুনীতিকে সুনীতি, আর সুনীতিকে কুনীতি বা নিজের মতো করে বানিয়ে নিয়েছে। যেমন- হেফাজত তার সাথে থাকলে ভাল। না থাকলে জঙ্গি। শিক্ষার নামে চারকীর নামে এখানে যা হয়। এবং এগুলা অর্জন করার জন্য নতুন প্রজন্ম ও তাদের পিতামাতা কি না করেন? এমনকি আমরা যারা সমাজের অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করি বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে প্রতিরোধের চেষ্টা করি তাদের মধ্যেও আছে বিপুল অনৈক্য।

সবাই ফেবু সেলিব্রিটি হতে চায়। কেউ চিন্তা দিয়ে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে চায়না। সবাই ‘ছোটলোক’ হয়েই খুশি। ফলে সব নীতির একটা পারভারর্সন সমাজে জারি হয়েছে। এবং এটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। হতে হতে এটার যে জঘন্য ফল তাও ফলতে শুরু করেছে সমাজের মানুষের মধ্যে, নতুন প্রজন্মের মধ্যে এবং এর কারণে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এটাকেই পোস্ট-নর্মাল কন্ডিশন বলা যাবে। বা এটাকে বুঝতে পারেন, যখন ট্রমাটিক থাকতে থাকতে সেটাও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে সেই অবস্থার সাথে মিলিয়েও পাঠ করতে পারেন। বাংলাদেশের অবস্থা এখন এমনই।

২. অন্যদিকে নির্বাচনকে নয়, আওয়ামী লীগ ভয় পায় ভোটকে। তারা নির্বাচন চায় শুধু ভোট নিজেরাই দিবে -এই আহ্লাদি অবস্থান নিশ্চিত করেই সব ধরণের নির্বাচন দেওয়া হয় এখন বাংলাদেশে। ভোটবিহীন এক নির্বাচনের সংষ্কৃতি চালু করেছে এই দেওলিয়া দলটি। কাজেই একটা দুধের শিশুও জানে এই সরকারের আমলে কোন নির্বাচনে সাধারণ মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে না। তাই নির্বাচন নিয়ে মানুষের এখন আর কোন আগ্রহও নাই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের শাসন কেবল নাৎসী কয়েদখানার সাথেই তুলনা হতে পারে। সাধারণ ছাত্রদের ছাত্রলীগ করতে বাধ্য করা হয়। যাকে তাকে জামায়াত-শিবির ট্যাগ দিয়ে দল বেঁধে পিটানো হয়। সাধারণ ছাত্রদের বিশ্ব বিদ্যায়ল জিবনটা পার করতে হয় চরম পরাধীনতার ভেতর দিয়ে। দেখতে হয় শিক্ষকদের অকথ্য নষ্টামি। ফলে তারা মানসিক ভাবে খুবই ক্ষতিগ্রস্থ বা একধরণের অসুস্থ্য অবস্থা নিয়েই বের হতে হয়। এমন কয়েদখানায় নির্বাচন দিয়ে কোন পরির্বতন সম্ভব না। যদি না আমরা এই অবৈধ ক্ষমতার মূলটা বিনাশ করতে না পারি। ঢাবি কোন বিচ্ছিন্ন দ্বীপ না। এটা গোটা বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদি শাসনের একটি ভাল উৎপাদন খানা এটা। আল মাহমুদ ঠিকই বলেছেন। এটা ডাকাতদের গ্রাম। এখানের শিক্ষক নামের ক্যাডার, ভিসি নামের অশিক্ষিত জোকারসহ গোটা প্রশাসন এই অবৈধ ক্ষমতার দাশ হিসেবে কাজ করে মাত্র। অনৈতিকতাই এখন বাংলাদেশে নীতি।

এই চর্চা সমাজের প্রতিটি স্তরে চালু হয়েছে ভয়াবহ চেতনাবাজির ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে। এখন সাধারণ ছাত্ররা মার খাচ্ছে। ছোট করে হলেও প্রতিবাদ শুরু হয়েছে। ডাকসুর ভোট আর জাতীয় ভোট এখন ভিন্ন কিছু না। বরং জাতীয় নির্বাচনের ভোটাধিকার রক্ষা না হলে ডাকসুর ভোটাধিকার নিশ্চিত করা যাবে না এই সত্য এখন বিনা তর্কতেই প্রতিষ্ঠিত হল। এটাই অর্জন এই ভোট ভোট খেলায়। ভিসি এবং ইসি সবাই একই জুলুমবাজের সেবাদাশ। কাজেই জনগনের অধিকার আদায়ের আন্দোলন ছাড়া এই ফ্যাসিবাদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করার আর কোন পথ খোলা নাই। কাজেই ছাত্রদের এখন ক্যাম্পাস ভিত্তিক বা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থবাদি জায়গা থেকে বিষয়গুলোকে না দেখে গোটা দেশের আহত-অপমাণিত জনগনের জায়গা থেকে দেখতে হবে। এবং জনগনের সম্মানের জন্য সমানে থেকে নেত্রীত্ব দেওয়ার ঐতিহাসিক দায়িত্ব এখন আমাদের উপর ন্যাস্ত হয়েছে। এই দায়িত্ব পালন না করে ফটকামি করলে আগামি সময়ের কাছে কুলাঙ্গার হয়ে বাঁচতে হবে। হতাশ হওয়ার কিছু নাই। ফ্যাসিবাদ এমনই। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধও হতে হয় ব্রুটাল।

কথা হল, আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করতে পারছি কি না। এখানে মিথ্যাকে মিথ্যা বলা জরুরী শুধু না রাজনৈতিক কর্ম। এই ধরণের সব কর্মকান্ডকে অবৈধ বলা। বর্জন করা। অসহযোগিতা করার যে নৈতিক শক্তি এটা ছাড়া কোন গণআন্দোলনের প্রাথমিক ভিত্তিও তৈরি হবে না। আর এটা করার জন্য যে ধরণের রাজনৈতিক এজেন্সি দরকার তার হাজিরা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: কবি, বিশ্লেষক, সম্পাদক দি জবানডটকম.

Facebook Comments

Hits: 103

SHARE