আওয়ামী দখলদারিত্ব এবং বিএনপির দায়ঃ পোস্টমর্টেম -২

197

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ আওয়ামী লিগের দখলদারিত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে তার শুধুমাত্র একটা নজীরই যথেষ্ট। একজন প্রিজাইডিং অফিসার ফেসবুকে সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরলে কয়েকদিনের মধ্যে তার হাত-পা বাঁধা লাশ পাওয়া যায়। বিষয়টি কত ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক এটি যাদের বুঝতে কষ্ট হয় তাদের মধ্যে কোন মানুষ বাস করে বলে আমি মনে করি না। আর এই বিষয়টি নিয়ে যে সকল বিরোধীদল রাজনৈতিক ভাবে নিশ্চুপ তারাও সমগোত্রীয় এবং একই চরিত্রের ভিন্ন আবরণে। এটি পরিস্কার।

গত পর্ব প্রকাশের পরে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে রাজনীতিতে আমার নিরাপদ অবস্থান আরও সংকটজনক পর্যায়ে যাচ্ছে। এমনিতেই আওয়ামী লীগের ভয়ে দেশে যেতে পারছিনা। বিএনপির একটি চক্রের দ্বারা ২০০৪ সালেই বিনা পরোয়ানায় আমাকে আমার ড্রাইভার, পিয়নসহ গ্রেফতার করে ক্রসফায়ারে নিয়ে গিয়েছিল; সেনাবাহিনী আমার পক্ষে থাকায় আল্লাহর ইচ্ছায় সে যাত্রা ৫ মিনিটের ফেরে বেঁচে গেলেও ময়মনসিংহে নিয়ে এসপি কোহিনুর ও ডঃ আক্কাস ভুইয়ার সরাসরি ভুমিকায় ৭ দিন নির্যাতন করে পঙ্গু করে দেয়। আমি ৩ বছর সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারিনি। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে কোন বিএনপি নেতা আজো আমাকে ”সরি” বলেন নাই। এমনকি তারেক রহমানও না।

অন্যদিকে এই ১৪ বছরে আওয়ামী লীগ বা তত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে লাগাতার বক্তৃতা করে বা লিখে গেলেও আমার বিরুদ্ধে একটা মামলাও দেয়নি। যদিও আমি বিশ্বাস করি শেখ হাসিনার সরকার আমাকে বাগে পাওয়া মাত্রই গুম করে দেবে।

যাক মুল কথায় আসি, নেতৃত্বের বিষয় নিয়ে আত্মসমালোচনার কোন সুযোগ বিএনপিতে নেই; তারা শুধু পক্ষের কথা শুনতে চায়; তাদের কাছে তাদের দলের না হলে বন্ধু বলে কাউকে শ্রদ্ধা জানানোর কোন পলিসি আর অবশিষ্ট নেই। কেউ ভুল শুধরে দিতে চাইলে তাকে নানান ভাবে অপদস্ত করা হয়। ফলাফল ১১ তম সংসদ নির্বাচনে এসেছে। কেউই রিস্ক নিয়ে মাঠে যাননি। কেন যাবেন সেটি কি কখনো কেউ ভেবে দেখেছেন? শুধু শেখ হাসিনাকে সরানোই যদি উদ্দেশ্য হয়, সেই তথাকথিত মুক্তির জন্য উল্টো আদর্শের লোকজনের সাথে বা উল্টো আদর্শের রাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার করায় কি সফলতা আসে? নাকি চিরদিনের শত্রূরা রাজনৈতিক সুযোগ পায় ধ্বংস করার; সেটি বোঝার মধ্যেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের সফলতা ও যোগ্যতা নিহিত। এটি বোঝার মত নেতৃত্বের অভাব এখন প্রকট বিএনপিতে।

কিছু অতি উৎসাহী যখন তারেক রহমানকে দলের মালিক হিসেবে প্রচার করেন তখন তা হয় আত্মঘাতী; গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বর্তমান সময়ে চাটুকারদের এই সকল প্রচারনা নতুন প্রজন্মের কাছে ভিন্ন বার্তা দেয়। এমনিতেই দলে তারেক রহমান জনপ্রিয় এবং তার পদের কোন প্রতিদ্বন্দ্বি নেই; কিন্তু তার নিজের পছন্দ করা হাইব্রিড গোষ্ঠী তাকে এমন উদ্ভট প্রচারণা দিয়ে বিতর্কিত করেন প্রতিনিয়ত। তিনি এরপরও এদের উপরেই নির্ভরশীল; এমনকি এই গোষ্ঠী লন্ডনে তারেক রহমানের একটি সাংগঠনিক অফিসিয়াল কাঠামোও গড়তে দেয়নি।

রাজনীতিতে একের পর এক ‘দুই অক্ষরের’ কিছু অশিক্ষিত বা স্বল্প শিক্ষিতদের বিশেষ ব্যক্তি বানানোর ইতিহাসেই হারিয়ে গেছে জেনারেল জিয়াউর রহমানের জাতীয়তাবাদী আদর্শ। সর্বশেষ সংযোজন সামান্য একজন ড্রাইভারের বিএনপির স্থায়ী কমিটির যে কোন সদস্যের চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা। সেই ড্রাইভারের পিতাকে হাসপাতালে দেখতে যখন শীর্ষ নেতাদের যেতে হয়েছিল তখনি বোদ্ধারা বুঝে নিয়েছেন যে রাজনীতির বারোটা বেজে গিয়েছে। সেই ড্রাইভারের বিরুদ্ধে কিছু না বলার জন্য বা না লিখার জন্য কমপক্ষে এক ডজন কাছের লোক আমাকে অনুরোধ করেছেন। শেখ হাসিনার কোন ড্রাইভার বা কাজের লোকের নাম জাতি না জানলেও বিএনপির শীর্ষ নেতার কর্মচারীদের নাম না জানা অপরাধ। এই ড্রাইভারের বিরুদ্ধাচরণ করে অনেক বিএনপি নেতাকেই মাফ পর্যন্ত চাইতে হয়েছে।

এরপরে আছেন অখ্যাত একজন জামায়াত ও হিজবুত তাহরির ফেরত অর্ধ হাস্যজ্জল ব্যক্তি যিনি যোগ্যতায় লন্ডনে লেবার পার্টির ওয়ার্ড কমিটির এক বহিষ্কৃত সেক্রেটারি। তাকে এমন ভাবে উঁচুতে উঠানো হয়েছে যে তাকে ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কই হয় না। বার বার তাকে ভারতে প্রেরন করা হয় দূতিয়ালির জন্য, সেই তাকেই আবার পাঠানো হয় তিন তিনবার চীনে, সম্পর্ক করতে; শুধু তাই নয় এরপর পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রেও। এমন যোগ্য কূটনীতিক পৃথিবীতে বিরল; এবং এই বিরল প্রজাতির কূটনীতিককে সবার উপরে ঠাই দেন বিএনপি নেতা। এমনকি তিনি যখন দিল্লীতে মিডিয়াকে বলেন,’বিগত দিনে বিএনপির বৈদেশিক নীতি ছিল ভুল এবং রাবিশ’ যা প্রকাশিত হয়েছিল; এরপরেও বিএনপি নেতৃত্বের কাছে তার গুরুত্ব বেড়েছে বই কমেনি। (চলবে)।

Facebook Comments
SHARE