একটি জাতির নৈতিক মৃত্যুর কাব্যনামা

461

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ বিশ্বের সমসাময়িক ইতিহাসে অনেক জাতি ধ্বংস হয়েছে, বিপর্যস্ত হয়েছে; কিন্তু কোন জাতির নৈতিক মৃত্যু হয়েছে এমন নজীর বিরল, যেটি বাংলাদেশের বেলায় ঘটলো। নৈতিকতার কোন অতলে নিক্ষিপ্ত হলে জাতির বিবেক ধ্বংস করে, অধিকার ডাকাতি করে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা ও পরিবার নিয়ে আনন্দ, উল্লাস করা যায়! এমন জাহেলি যুগ নম্রুদ, ফেরাউন বা হিটলারের সময়েও ছিল না; যা ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে রাখতে আগামীর সন্তানদের সামনে কোটি কোটি পাপিষ্ঠ দাঁত কেলিয়ে বিনষ্ট করে দিলো একটি জাতির সততা, নিজের সন্তানদের শিখিয়ে শামিল করে নিলো চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, মাদক, গুম আর খুনের সাথে। মৃত্যু ঘটল একটি জাতির।

হ্যাঁ আমি বলছি সাম্প্রতিক বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে। অন্যায়কারী আর অন্যায় সহ্যকারি সকল পাপিষ্ঠ এই পাপের সম অংশীদার। একপক্ষ এমন কর্ম করতে করতে সিদ্ধ হস্ত হয়েছে; অপর পক্ষ তার বিপরীতে কোন সৎ নজীর রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করেছে তারা; কিন্তু নিজেদের ঘরেই গলা টিপে মেরেছে গণতন্ত্রকে। গড়ে তুলেছে কোটারি গোষ্ঠী; যাদের কারনে নিপীড়িত হয়েও তারা গণতন্ত্রের বা সততার নজীর গড়তে পারেনি; যে কারন আরও বলিয়ান হয়েছে নষ্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা আর তার দখলকারীরা।

আমি কি বলতে চেয়েছি, কোন ক্ষোভে আজ লিখছি সেটা সবাই বুঝছেন; তারপরেও বিবেকের মৃত্যু হওয়া রাষ্ট্রপক্ষ ও বিরোধীপক্ষ কেউই আমার পক্ষে দাঁড়াবে না জানি; তারপরেও কাউকে না কাউকে তো সত্য কথাটা বলে যেতে হবে! রিস্কতা না হয় আমিই নিলাম। তাই আমি লিখছি তাদের জন্য যারা এখনো ভোটের মালিক হয়নি, যারা রাষ্ট্রের মেরামতের কাজ শুরু করেছিল, যাদের বিবেক এখনো মরেনি; আমি সেই তাদের জন্য এই কথাগুলো লিখছি। একদিন যদি কেউ সেই অনাগতকালে আমার এই লেখা পড়ে মৃত বিবেকের জাতিকে লাথি মেরে দাড় করাতে পারে। সম্পন্ন করতে পারে রাষ্ট্রের মেরামতের কাজ।

এমন অসৎ, বিবেক বর্জিত মুসলমান হয় কিভাবে? আমার মতে বর্তমান পৃথিবীর নিকৃষ্ট মুসলিম জাতিতে পরিনত হয়েছে বাংলাদেশীরা। কিভাবে? আসুন বিশ্লেষণ করি। এরা অজু করেও ঘুষ খায় অফিসে। ঘুষের টাঁকা মসজিদ মাদ্রাসায় দান করে; মউলানারা এখন দানের টাকা সৎ না অসৎ উপায়ে কামাই করা তা যাচাই করে না। মসজিদে কোন খুতবায় অসৎ উপায়ে অর্জনের বিরুদ্ধে কথা নেই; মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ঘুষ চলে দেদারসে। সাধারন শিক্ষা ব্যবস্থায় ঘুষের ব্যবহার আরও ভয়াবহ। এরপর এই শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে বের হওয়া মানুষগুলো ঘুষ দিয়ে চাকুরী নেয়; সারাজিবন ঘুষ খায়।

যারা চাকুরী করে না, তারা যদি ব্যবসা করে, তবে প্রতিটি স্তরে ঘুষ দিয়ে ব্যবসা করতে হয়, ব্যবসার প্রতিটি স্তরে ভেজাল মিশ্রিত হয়; খাদ্যে ভেজাল তো এখন মামুলি বিষয়; মজুতদারি কোন অন্যায় বলে বিবেচিতই না। এরপর আসেন বেসরকারি চাকুরী, সেখানের প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অসৎ কাজে নিজেদের জড়াতে হয়; যেমন মিডিয়া; এখানে বিবেক ও সততা বলে কিছু অবশিষ্ট নেই; নিজের পরিবার বাঁচানোর নামে মালিকদের অসৎ নীতিমালার পক্ষে কাজ করতে হয়।

সরকারী চাকুরীর মধ্যে পুলিশ হলেতো কথাই নেই; তারা কি করে তা এক একজন বিবেকহীন নাগরিককে জিজ্ঞেস করলেও তাদের ঘৃণা জানাবে। আমলারা কি তার সর্বশেষ নজীর সর্বশেষ নির্বাচন। এরা চুরি ছাড়া জীবনে আর কিছু শেখে না এখন। বিচার বিভাগের ইট পাথরেও টাকা খায় বলে কথা প্রচলিত। আর পুলিশ, আমলা ও বিচারবিভাগের কারনে বেড়ে উঠেছে মাদক মাফিয়াদের সাম্রাজ্য। কালোবাজারির কথা আর নাই বা বললাম।

পেশাজীবী যারা, সেই ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী, টেকনিশিয়ান, এমনকি ড্রাইভার, ক্যাব চালক, রিক্সা চালকও নানান ভাবে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করে। সবাই নিজেদের সংগঠিত শক্তি হিসেবে নিজ নিজ ক্ষেত্রে লুটপাট চালায় না হয় নাগরিকদের জিম্মি করে ফায়দা লোটে।

রাজস্ব আয়ের যতগুলো দপ্তর রয়েছে, কাস্টমস, ভুমি দপ্তরসহ সেখানে কি তুকঘলগি কারবার চলে,বিদ্যুত, জালানি ও খনিজ বিভাগে, পানি উন্নয়নে যে বিশাল লুটপাট তা কল্পনার বাইরে। সাংবাদিক সাগর -রুনি জীবন দিয়ে গেছেন কিন্তু ঐ সকল সেক্টরের লুটপাট কিভাবে হয় বিএনপির সাবেক কোন মন্ত্রীও কিন্তু কখনো বলেন নাই। খাওয়ার রাস্তা সবাই খোলা রাখেন।

এই সকল কিছুর পরেও মানুষ তাকিয়ে থাকতো রাজনীতিবিদ আর সশস্ত্র বাহিনীর দিকে। সেই রাজনীতিবিদদের চরিত্র দেখে এখন সাক্ষাত ইবলিশও আঁতকে ওঠে। এমন বাংলাদেশী রাজনীতিবিদ ইবলিশ আমলে থাকলে ইবলিশকে আর বেহেশত থেকে বিতাড়িত হতে হতো না! এরা কাগজে কলমে কেউ গণতান্ত্রিক, কেউ জাতীয়তাবাদী, কেউ ইসলামী, কেউ কমিউনিস্ট, কেউ মার্ক্সবাদী, কেই উদারপন্থী, যদিও এগুলা কাগজে পত্রে সীমাবদ্ধ, প্র্যাকটিসে কোথায়ও এক বিন্দু নেই; চরিত্রের সবাই এক। এদের সবার প্রতিপক্ষ হচ্ছে জাতি। আর এদের কোটারি হচ্ছে পরিবার বা গোষ্ঠীতন্ত্র।

মৌলানারা এক একজন কত সম্পদ আর টাকার মালিক হয়েছে, কিভাবে অনেকেই জানেন না। মানুষ এদের এখনো বিশ্বাস করে, নিজের সন্তানকে না খাইয়েও হুজুরের জন্য মুরগির গোস্তটুকু গরীব মানুষ এখনো হুজুরকে দিয়ে আসে। আমি কত শত প্রতারক মউলানা দেখেছি তার বর্ণনা দিতে পারব না। এদের মধ্যে বাকী ছিল তাবলীগ জামায়াত; তারাও আজ একে অপরকে হত্যা করতে চায়। ইসলামী রাজনিতিকদের কিসসা বলে শেষ করা যাবে না। জামায়াতের সদ্য ডিমের ভেতর থেকে বের হওয়া বাচ্চাটিও জামায়াতের বাইরের কাউকে নিজের কাছের মনে করে না। আর এক একজন নিজেদের মহা পণ্ডিত ভাবেন। ইহুদীদের মত এরা নিজেদের ছাড়া কাউকে বিশ্বাসও করে না; তবে এদের মধ্যে একদল অর্থনৈতিক প্রতারক রয়েছে যারা এদের সাথেই আছে, কিন্তু প্রমানের সময়ে এদের অস্বীকার করা হয়।

আওয়ামী লীগের দিকে তাকালে দেখবেন শেখ টাইটেলধারী এবং তাদের আত্মীয় নির্বাচনে নমিনেশন পেয়েছে প্রায় অর্ধেকের বেশি। আর বাকী অর্ধেক কোন না কোন ভাবে এদের সাথে সম্পৃক্ত না হয় তাদের সরাসরি গোলাম বা সাপ্লায়ার। এদের আবার ছোট ছোট পরিবারের ইউনিটও রয়েছে শাখাগুলোতে।

বিএনপির দিকে তাকান, মালিক পরিবারের সাথে সম্পৃক্ত লোকজন কম হলেও এরা প্রতিটি ইউনিটে গড়ে তুলেছে এক একটি পরিবার আর পুরো নেতা কর্মীদের কোন না কোন ভাবে এদের গোলাম বানিয়ে রেখেছে। নির্বাচনের সময় এরা মনোনয়নে অগ্রাধিকার দেয় পরিবার গুলোকে। মনোনীত ব্যক্তি কোনভাবে হোঁচট খেলে বিকল্প হয় তাদের অখ্যাত, রাজনীতি না জানা স্ত্রী বা সন্তানেরা; কোন মুল্য দেয়া হয় না পোড় খাওয়া অভিজ্ঞ ২য় বা ৩য় নেতাকে। যদিও দেয়া হয় তা হচ্ছে বিরল।

রাজনৈতিক এই ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে সবচেয়ে বড় মাফিয়া সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্য তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক আদর্শ চর্চাহীনতার সুযোগে। মাদকের টাকার ভাগ যেমন আমলা, পুলিশ, বিচার বিভাগে যায়, তেমনি যায় প্রতিটি রাজনৈতিক দলে সরাসরি না হয় ঘুরিয়ে; যেমন যায় মসজিদ, মাদ্রাসা বা অন্যান্য চ্যারিটিতে। জি ইসলামী রাজনীতিতেও আজকাল ব্যবসা বানিজ্য করার গ্রূপ তৈরি হয়েছে। দেশে তারা ঘুষ দিয়েই ব্যবসা করেন, আর বিদেশে তারা করেন শ্রেফ প্রতারনা নিজ দলের বাইরের লোকজনের সাথে। শত শত প্রমান রয়েছে। বিদেশে বাংলাদেশীদের মসজিদগুলোর বেনিফিসিয়ারিদের ডাটা খুঁজে দেখুন কে কিভাবে কত টাকা নিয়ে যাচ্ছেন আর কত সম্পদের মালিক হচ্ছেন। অন্যরা খবরও রাখেন না।

এবার আসি সর্বশেষ ইভেন্ট ‘১১ তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন’ নিয়ে। এ নির্বাচনে কি হয়েছে সবার চেয়ে বেশি জানেন বহুবার হজ্ব ওমরা করা শেখ হাসিনা ও তার পরিবার। নির্বাচন কমিশনের লোকজন তো জানেনই। এদের কি কোন লজ্জা আছে? আচ্ছা এরা নিজের সন্তানদের সামনেও কি লজ্জা পান না? ঘুষখোর আর লুটপাট করে টাকা বানানো লোকজনের স্ত্রী সন্তানেরা এখন বুক ফুলিয়ে চলেন সমাজে। তাই হয়তো এরা কেউই লজ্জা পান না। আর পাবেনও না। এইভাবে কেউ কি ভোটে নষ্টামি করে? পতিতারা যেমন লজ্জা পায়না তাদের কাজে, নির্বাচনের পড়ে দেখলাম সংশ্লিষ্ট কেউই তেমনি লজ্জা পাচ্ছে না; সগৌরবে নিজেদের নষ্টামি নিয়ে বড়াই করছে। আর মৃত আত্মার বিবেকের নাগরিকেরা তা শুধু গিলছে; এরাও পাপী তাই সহ্য করছে।

জাতির সর্বশেষ ভরসা ছিল সশস্ত্র বাহিনী; পিলখানার হত্যাকাণ্ডের পর তাদের অবস্থা এমন হয়েছে যে, বিবিসি’র একটি ভিডিওতে দেখলাম নাগরিকদের অভিযোগ শুনে এরা দৌড়ে গাড়িতে উঠে সোজা পালিয়ে গেল; অভিযোগ শুনেছি কোথাও কোথাও সেনাবাহিনীর লোকজন নৌকায় ভোট দিতেও বলেছে ভোটারদের। এ নিয়ে আরেকদিন লিখবো। তবে এই যে দৌড়ে পালানো সেনাবাহিনী যারা এখন ব্যবসায়িক সশস্ত্র প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে; তাদের দ্বারা আর জাতি বা রাষ্ট্র রক্ষা করা সম্ভব নয়; শুধুমাত্র রাষ্ট্র দখলকারীদের পাহারা দেয়াই সম্ভব; সশস্ত্র বাহিনীর নৈতিকতাও এখন জীবন্ত কবর হয়েছে।

আরও অনেক বিষয় বাদ পড়ে গেছে; ভবিষ্যতে আমাদের সন্তানদের জন্য বেঁচে থাকলে আবারো লিখবো; যেন তারা এই মৃত বিবেক ও নষ্ট সততার জাতির কবরের উপর নতুন করে প্রতিষ্ঠা করতে পারে আরেকটি নয়া জাতি স্বত্বার। সেই রাষ্ট্রের মেরামত শুরু করাদের অপেক্ষায় থাকবো; যাদের জন্য আতঙ্কিত সকল অসৎ রাজনিতিক, আমলা, পুলিশ, আর্মি, বিচারক সব।

পুনশ্চঃ আমার এই লেখার যারা বিরোধীতা করবেন, তারা দয়া করে নিজের বুকে হাত রেখে বলুনতো কোথায় আমি মিথ্যা লিখেছি? তবে যদি আপনার বিবেকও মৃত হয়ে থাকে ইতিমধ্যে, তবে প্লিজ আমাকে গালি না দিয়ে যাবেন না। কারন আমি কিছু জীবন্ত লাশের অহমিকা দেখতে চাই। আমি নিজে কোন দরবেশ নই; আমিও এখন এই মৃত জাতির এক অংশ যে কোন প্রতিকার করতে সক্ষম না; কিন্তু লিখে কিছুটা দায়মুক্ত হলাম নিজের বিবেকের কাছে।

Facebook Comments
SHARE