৩০ ডিসেম্বরঃ গণজোয়ার নাকি ছকবাঁধা ফল?

212

শাহ আলম ফারুকঃ
১. ফলাফল যাই হোক না কেন, নানা কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আলোচিত হয়ে থাকবে। ৯০ পরবর্তীতে দলীয় সরকারের অধীনে এটা তৃতীয় নির্বাচন। প্রথমবার নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ এর ১৫ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিএনপি সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সবার জানা আছে – সেই নির্বাচনের ফলে গঠিত সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করে। তারপর ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কার্য়ত: একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্ধিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সহ বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাক্কালে বলা হয়েছিল- সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার জন্য ঐ নির্বাচন প্রয়োজন হলেও খুব শিগগির সব দলকে নিয়ে নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। তারপর দিনে দিনে সে সরকারই পুরো পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেছে।

২। সে যাই হোক বলেছিলাম নানা কারণে এ নির্বাচনটি বাংলাদেশের জাতীয় ও গণতন্ত্রের ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হবে। বরাবরই বাংলাদেশে নির্বাচন মানে ছিল উৎসব। নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে চা দোকান গুলো সরগরম হয়ে উঠতো। অস্থায়ী নির্বাচনী ক্যাম্পগুলোতেও নানা রকম আপ্যায়ন, সভা মিছিলের আয়োজন, ভোটার স্লিপ বিতরণ, এলাকায় পোস্টার ব্যানার লাগানো, মাইকিং এর মাধ্যমে নানা আকর্ষণীয় শ্লোগানে মুখরিত হোত নির্বাচনী পরিবেশ। গোপনে বিশেষ করে হতদরিদ্র এলাকার ভোটারদের টাকার লোভ দেখানো হোত বলে জানা যেত। বাডি বাডি এলাকায় এলাকায় সাজ সাজ রব। এমনকী সামরিক শাসকদের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও পরিবেশ বরাবরই কম বেশি জমজমাট ছিল। এমনকী কেন্দ্র দখল, রেজাল্ট বদল সহ জানা অজানা পন্থায় নানা ভাবে ইলেকশন ইন্জিনিয়ারিং হলেও উৎসব ভাবের কমতি ছিল না।

৩। এবার বিষয়টি ভিন্ন। নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হতে না হতেই বিরোধী দলজোটের শুধু কর্মী সমর্থকই নয়, এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধ শতাধিক প্রার্থী সরাসরি হামলার শিকার হয়েছেন। হামলার শিকার হয়েছেন ড: কামাল সহ ঐক্য ফ্রন্টের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। সুপ্রীম কোর্ট বারের সেক্রেটারী ঐক্য ফ্রন্ট প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহাবুব উদ্দিন খোকনকে থানার ওসি গুলি করেছে। গণহারে মিছিল সমাবেশে সরকার পক্ষীয় ক্যাডাররা হামলা চালিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সবযোগী বা সরাসরি ঐ ক্যাডারদের সাথে হামলায় অংশ নিচ্ছে। যারাই প্রচারণায় সক্রিয় হচ্ছে তাদের বাডি ঘরে তল্লাশী হচ্ছে। ভাংচুর, যখন তখন যাকে তাকে গ্রেফতার করে উল্টো নানা অভিযোগ করা হচ্ছে। এরিমধ্যে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করেন বিরোধীরা শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করার ষডযন্ত্র করছে। পরে দেখা গেল চুয়াডাংগাতে দিন দু তিনেক আগে এক ছাত্রলীগ নেতা টিটু এএসপি’র গাডিতে ককটেল মেরে পালিয়ে যাবার সময় হাতেনাতে ধরা পডে্। স্থানীয় এক ছাত্রলীগ নেতা ধৃত টিটুর রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চিত করে।

যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টটি পরবর্তীতে পাল্টে দিয়ে হামলাকারীর রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় এসেছে- সরকার দলীয় নেতা, সংসদ সদস্য, এমনকী পুলিশ পর্যন্ত নানা ভাবে হুমকি ধামকি পুলিশ দিয়ে গ্রেফতার হয়রানি করে বিরোধী লোকজনকে এলাকা ছাডা, ভোট ডাকাতি, ভোটারদের কার্যত: ভোট কেন্দ্রে না আসার জন্য হুমকি দেয়ার কথা বলছেন। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক সহ শীর্ষ নেতারা দল ক্ষমতায় না এলে কর্মী নেতাদের কি পরিণতি হবে তার ধোয়া তুলে মাঠ পর্যায়ে দলের কর্মী সমর্থকদের উস্কানি দিয়ে বেপরোয়া করে তুলেছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। এদিকে নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ইতিমধ্যে হয়ে গেছে বলে বার বার বলছে। যার সাথে সাদা চোখেই বাস্তবের কোন মিল নেই। অতীতে বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু এলাকায় ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে নিরুৎসাহিত করা হলেও অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় এটা এবার সরকারী দল জোট এজেন্ডা হিসেবে নিয়েছে।

৪। নির্বাচনী পর্যবেক্ষকরা যে কোন নির্বাচনের একটি অপরিহার্য পক্ষ। প্রথমো পর্যবেক্ষক, পরে সাংবাদিকদের জন্য যে সব নীতিমালার কথা বলা হয়েছে সে গুলো শুধু অদ্ভূতই নয়, অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে অভিনবও বটে। কোন লাইভ সম্প্রচার, ছবি তোলা, ভোটারসহ সংশ্লিস্ট সব পক্ষের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে হাস্যকর কিছু বিধিমালা করা হয়েছে। স্বভাবতই তাদের কর্মকান্ডে প্রতীয়মান নির্বাচন কমিশন কিছু একটা লুকোতে চাইছে। একজন কমিশনার বাদে গোটা ইসিই ইচ্ছেকৃত বাস্তব পরিস্থিতিকে অগ্রাহ্য করে বিশেষ এক মিশনে কাজ করছে। আর এটাও স্পষ্ট প্রশাসন আইন শৃংখলা বাহিনীর কমান্ড সব কিছু গত ক মাস ধরে সাজানোই হয়েছে একটি বিশেষ নির্বাচনী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য। সর্বশেষ যখন এ লেখা লিখছি তখন খবর পেলাম বরিশালে ঐক্য ফ্রন্ট প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপনের বাডির দরজা ভেংগে পুলিশ প্রবেশ করার চেস্টা করছে।

৫। শুরুতে বলেছিলাম এবার নির্বাচন ফলাফল সাধারণভাবে যাই হোক না কেন তা অনেক অনেকভাবে ভবিষ্যতে আলোচনায় থাকবে। অতীতে এমনকী এরশাদ আমলে, ওয়ান ইলেভেনের কঠিন সময়েও রাজনীতির পাশাপাশি নাগরিক সমাজের একটা উচ্চকিত কন্ঠ শোনা যেত। অনেক সংকটের সময় নাগরিক সমাজ এগিয়ে এসে মানুষের অধিকার, জাতীয় স্বার্থ, বিভিন্ন সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক শক্তির জনবিরোধী কর্মকান্ডে সোচ্চার প্রতিবাদ করতো। কেউ মানুক না মানুক সংশ্লিষ্ট মহলে নানা সুপারিশ দিত। কিছু ক্ষেত্রে কাজ হোত। সাধারণ মানুষ সামান্য হলেও কিছু ভরসা পেত।

এখনও মনে আছে ২০০১ এর নির্বাচনের সময় আইন ও সালিশ কেন্দ্র আসকের পক্ষে ফেনী জেলার নির্বাচন পর্যবেক্ষণ টীমের সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছিলাম। সাংবাদিক টিপুর উপর তৎকালীন গডফাদার খ্যাত জয়নাল হাজারীর ক্যাডারদের আক্রমণ সে সময় দেশব্যাপী আলোচিত ছিল। সে যাই হোক লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নিতে না নিতেই জয়নাল হাজারীর বাসায় অভিযান হলে সেই অসীম দোর্দন্ড প্রতাপশালী সংসদ সদস্য রাতের আঁধারে ফেনী ছাডে্ন। পুরো ফেনী জুডে তখনো ভয় আতংক। এক মধ্যে পর্যবেক্ষক হিসেবে সারা জেলায় আমরা ছুটে গেলাম। জনকন্ঠ থেকে গিয়েছিলেন ফজলুল বারী ভাই। শুধু ফেনীই নয় নির্বাচনের আগে নানা জায়গায় নির্বাচনী আচরণ বিধি লংঘনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সহ সরকারের নানা দফতরের সাথে প্রতিকারের জন্য আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমরা যোগাযোগ করতাম।

আজ শুনতে পাই সময়ের পরিবর্তনে আসকের বর্তমান নির্বাহী পরিচালক গত ১৫ দিন ধরে নিজ এলাকায় নিজের ভাইয়ের পক্ষে ভোট চেয়ে বেডাচ্ছেন। সংস্থার গাডিও তিনি ব্যবহার করে চলেছেন নির্বাচনী প্রচারণায়। অথচ বিরাজমান পরিস্থিতিতে দেশের অন্যতম শীর্ষ স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন হিসেবে তিনি এখন সংগঠনের নির্বাচন সংক্রান্ত কর্মযজ্ঞে নেতৃত্ব দেবার কথা। উপরন্তু কনফিল্কট অব ইন্টারয়েস্টের বিষয় আছে। তিনি যে প্রার্থীর পক্ষে ভোট চাইছেন সেই প্রার্থীর দল বর্তমান সরকারে। গত দশ বছরে গুম খুন বিচারবহির্ভূত হত্যা, প্রধান বিচারপতিকে দেশত্যাগে বাধ্য, ভিন্নমত দমনে তাদের অনেক ব্যবস্থা নিপীডনমূলক বলে বিবেচিত হয়েছে। এবং এ সবের জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ কখনো ক্ষমা স্বীকার বা যথাযথ ব্যবস্থাও নেয়নি। উপরন্তু নিস্পৃহভাবে সব অস্বীকার করে গেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সালমা সোবহান আজ নেই। ব্যক্তিত্ব মানবাধিকার চেতনায় তিনি ছিলেন কিংবদন্তীসম। কাছের মানুষরা জানেন- প্রফেসর রেহমান সোবহানের পরিবারের সাথে বংগবনধু পরিবারের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কিন্তু তা কখনো সালমা সোবহানের প্রাতিষ্ঠানিক সাংগঠনিক কর্মকান্ডকে প্রভাবিত করেনি, বরং উল্টোভাবে যেন কর্ম তৎপরতা বেশি ছিল। বস্তী উচ্ছেদ, নারায়ণগন্জে পতিতালয় উচ্ছেদসহ নানা ইস্যুতে আসকের ভূমিকা দৃঢ্ ভূমিকা ছিল। পরবর্তীতে সুলতানা কামাল আপার আমলেও তা অব্যাহত ছিল। সেদিনও তিনি বর্তমান গায়েবী মামলাও বিরোধীদের জন্য অসামন্জস্য রাজনৈতিক পরিবেশ নিয়ে বলেছেন। আসকের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ড: হামিদা হোসেনও নিরন্তর শ্রম অধিকার মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে গেছেন। আর তাদের উত্তরসূরী হিসেবে বর্তমান নির্বাহী পরিচালক দৃশ্যত: অনাকাংখিত এবং নিজ পেশার সাথে অসামন্জস্য কাজ করছেন, সেটা বলাই বাহুল্য। সেদিন ডেইলী স্টার নির্বাচনী সংলাপে সৈয়দ আবুল মকসুদ বলছিলেন নাগরিক সমাজ গত দশ বছরে নির্জীব একটা অবস্থায় চলে গেছে। এ সময়ে নাগরিক সমাজকে বিভিন্নভাবে, লোভ বা ভয় দেখিয়ে দমন করা হয়েছে। ঠিক যেন বিরোধী দলের মতো। জানি না আসকের বর্তমান নির্বাহী পরিচালক কি জন্য বিতর্কিত ভূমিকায় আছেন!

সে যাক ব্যতিক্রম বাদে নাগরিক সমাজ মিডিয়া প্রশাসন সব কার্যত দর্শক ও পরিকল্পিত ছকে কাজ করছে। তবে কী ভয়ের পরিবেশে কাংখিত ছকে সব কিছু হয়ে যাবে? ইতিহাসে এমন কিছু ক্ষণ আসে যখন প্ল্যান এ বি সি কোনটাই কাজ করে না। ভোট মানুষের অধিকার এবং ভোটের দিনটা নাগরিকের একান্ত নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগের দিনও বটে। ঢাকা শহর থেকে ইতিমধ্যে নিজ এলাকায় মানুষ ব্যাপকভাবে যাচ্ছে।উৎসবের ছুটির মত নাকি ঢাকা ফাঁকা হচ্ছে এক অগ্রজ জানালেন।

যেই হারুক বা জিতুক এ মানুষগুলো ভোট দিতে পারলে গণতন্ত্র জিতবে। এক নির্বাচনে সব অর্জন হবে এটা আশা করা যায় না। কিন্তু গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ হলে ভবিষ্যতে কম বেশি সবাইকে বিশেষত: গোটা জাতিকে অনেক অনেক মূল্য দিতে হবে এটা বলাবাহুল্য।

Facebook Comments
SHARE