সত্যবাবু কবে মারা গেলেন?

290

রেজাউল করিম রনিঃ সত্যবাবু কবে মারা গেলেন? এটা কেউ সঠিক করে বলতে পারছেন না। বিখ্যাত দার্শনিক গ্রহাম হারমেন (নতুন বই, অবজেক্ট অরিয়েন্ট অনটলজির ভূমিকাতে -পেলিকন বুক-২০১৮) বলতেছেন, আমেরিকার নির্বাচনে যেদিন ট্রাম্প জিতে গেলন সেই দিন প্রমাণ হলো সত্যের প্রতি সব শ্রদ্ধা আমেরিকার জনগন হারায়ে ফেলছে। 

কারণ, নির্বাচনী প্রচারণার সময়ই ট্রাম্প চোখেমুখে যে সব মিথ্যা বলেছিল তার বড় বড় সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল সাথে সাথেই নিখুত প্রমাণসহ। কিন্তু কামের কাম কিছুই হয় নাই।  জিতে গেল ট্রাম্প। সেই দেশে ভোট চুরি হয় নাই।  চুরি হয়েছিল বিবেক।  অনুভূতির রাজনীতি সত্যকে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা বাগিয়ে নিতে পারে এটাই প্রমাণিত হয়েছিল।  জনগন আফিমগ্রস্থ হয় ইন্টারপ্রিটিশনে।  বয়ানে।  ট্রাম্প এটাই করেছেন।

ভারতে সত্য মরছে গুজরাটের কসাই যখন প্রধানমন্ত্রী হল এবং তারে এখন পূজাও করা হয়। এগুলা সবই হল সাম্প্রতিক সময়ের সত্য নিহত হওয়ার আলামত।

বাংলাদেশে সত্য নিহত হয়েছে সেই শুরুর কালেই।  কথায় কথায় ৩০ লাখ শহীদ, ২ লাখ ইজ্জত হারানোর আর্তনাদ ঘোষণার মধ্যদিয়ে। এটার কোন প্রমাণ নাই। সুবাস বসুর নাতী শর্মিলা বসু এটা নিয়ে কাজ করেছেন। (দেখুন,Dead Reckoning: Memories of the 1971 Bangladesh War Book by Sarmila Bose)। তারে এই জন্য আর বাংলাদেশে আসতে দেয়া হয় না। যা হোক সাম্প্রতিক সময়ে সত্য নিহত হয়ে এখন পচে গন্ধ ছড়াচ্ছে।

এই যুগকে তাই বলা হচ্ছে পোষ্ট ট্রুথ বা সত্যউত্তর যুগ। সত্য বলার বা সত্যের উপর থাকার দিন শেষ নাকি। এই পোষ্ট-ট্রুথ যুগের আসল সুবিধা নিচ্ছে ফ্যাসিস্ট ক্ষমতা। এটা অন্য আর একদিন বিস্তারিত লিখবো নে।

মানুষ মিথ্যাকে রাজনৈতিক ভাবে ডিফেন্ড করেন। এরা মিথ্যার পক্ষে দাঁড়ায়।  বিপুল মানুষ এখনও লীগ করেন এটা দেখে অনেকের অবাক লাগে। আসলে অবাক লাগার কিছু নাই।  নিতসে তো কইছে, ফ্যক্ট নাই সব ইন্টারপ্রিটেশন।  এই ইন্টারপ্রিটেশন যখন হাজির হয় তখন যদি না আমরা এটাকে মোকাবেলা না করি, তাইলে আসলে মিথ্যার শাসন মেনে নেয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

আজকের ফ্যাসিবাদ আমরা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি অনেক দিন হল। বাংলাদেশের মানুষ প্রথম পরিজিত হয়েছে, যখন ইতিহাস আইন করে ঠিক করে দেয়া হল।  যখন কালা কানুনের মাধ্যমে প্রচন্ড মিথ্যাকেই সত্য বলে বৈধতা দেয়া হল। জাতির পতিা নিয়া, ৭১ নিয়া প্রশ্ন তোলা নাকি আপরাধ?
যখন ইতিহাসের দখল দারিত্ব নিয়ে নিলো এই সরকার -তখনই বাংলাদেশের জনগন ক্ষমতার দাসে পরিণত হয়েছে আসলে। এটা তখন অনেকেই বুঝতেই পারে নাই।

এই যে ৭১ এর দলীয় বয়ানটা ‘জাতীয়’ ইতিহাস হিসেবে চাপিয়ে দেয়া হল তখন এটা নিয়ে কেন আমরা প্রতিবাদ করি নাই? তখন এটার ভয়াবহতা বুঝে আমরা যারা কথা বলেছি আমাদের কথা আমলে নেয়া হয় নাই।  আমাদের রাজাকার বলা হয়েছে।  এখন এই চেতনায়িত ইতিহাসের দোহাই দিয়ে নদীতে বিরোধী দলের লাশ ভাসায়েও প্রকাশ্যে সব ঠিক আছে এমন ঘোষণা দেয়াটা নিয়মিত ব্যাপার হয়ে গেছে। মিথ্যার এতো বড় বড় রিয়েলিটি শো হাজির হচ্ছে যে অবাক হওয়াও ক্ষমতা আমরা হারায়ে ফেলছি। তার পরেও বিপুল লোক মিথ্যার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। কারণ তারা এই বয়ানকে বিশ্বাস করেছেন।  এই ব্যাখ্যার রাজনীতি না বুঝলে নতুন ক্ষমতা তৈরি করা মুশকিল।

বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদের এখন প্রধান কাজ হল এই মিথ্যার ফ্যক্টরী থেকে যে সব বয়ান হাজির করা হয় তা নিষ্ঠার সাথে মোকাবেলা করা। কাউন্টার ইন্টারপ্রিটেশন দিয়ে এই ক্ষমতার ডিসকোর্স বা বয়ানকে পরাজিত করা। তাইলেই রাজনৈতিক বিজয় সহজ হবে। এটাই এখন আসল কাজ।

লেখকঃ সম্পাদক, জবান

Facebook Comments

Hits: 27

SHARE