…….. মহোদয়ের আগমন; শুভেচ্ছা স্বাগতম

83

সা কা ম আনিছুর রহমান খান: অসহায় মানুষ তার আবেগ অনুভ’তির কথা অনেক সময় আপন মনেই বলে ফেলে। প্রভাব, প্রতিপত্তি ও অর্থশালীগণ যখন তার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তখন সে তার কষ্ট লাঘবের উপায় খুঁজে পায় না, সমস্যা সমাধানের কোন পথের দিশা পায়না। মনের দুঃখ, ক্ষোভ নিজের মনেই চেপে রাখে। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে অন্যভাবে। কখনো অযথা অন্যের উপর রেগে যায়। কখনো বিমর্ষ হয়ে থাকে। কখনো এ্সব প্রভাব প্রতিপত্তি ও অর্থশালীদের কোন দুঃখ বা ক্ষতির বা সমালোচনার কথা শুনে উল্লসিত হয়। নিজের দুঃখ-ক্ষোভ অসহায়ত্বেও প্রকাশ ঘটায় বিড়বিড় করে আপন মনে কথা বলে। কেউ কেউ নিজের সমব্যথীদের সাথে এসব বিষয় নিয়ে ভাব-বিনিময়করে। কিন্তু কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নিতে পারেনা। তা নিতে গেলে অনেক বাধা হুমকি চোখ-রাঙানীর সম্মুখীন হতে হয়। এর ফল হয় ভয়াবহ। তাই প্রকাশ্য প্রতিবাদ কেউ সচরাচর করেনা।

এরূপ এক কর্মজীবী মহিলা চপলা নিগার ডেইজি। গণপূর্ত বিভাগে পিওন পদে চাকুরী করে। ‘ দৈনিক মজুরী ’ ভিত্তিক। তার চাকুরী এখনও রাজস্ব খাতের অন্তর্ভূক্ত হয়নি।তার স্বামী আতোয়ার রহমানও বে-সরকারী ব্যাংকে‘ প্রহরী’ পদে চাকুরী করে। দু’জনের আয়ে চলে তাদের সংসার। সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করবে এটাই তাদের আশা। দুইটি কন্যা ও একটি পুত্র তাদের। অনেক কষ্টে এদেরকে স্কুলেভর্তি করেছে। অফিস ও ব্যাংকের কর্তাগণও তাদেরকে সময়ে সময়ে সাহায্য সহযোগিতাকরে থাকে। সন্তানেরাও লেখাপড়ায় বেশ ভালো করছে। মেয়ে দুইটা অষ্টম ও সপ্তম শ্রেনীতে পড়ছে। ছেলে পড়ছে ষষ্ঠ শ্রেণীতে। পাঠশালার পর্ব শেষ করে তারা এবার উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ‘নেছরাপাড়াদহ হাই স্কুল’ বাড়ির কাছেই। এখানে ছেলে ও মেয়েদের পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে, তবে ছাত্র শাখা ও ছাত্রী শাখা পৃথক। ছেলেমেয়েদের ও অবাধ মেলামেশার সুযোগ নাই। সে কারণেই অভিভাবকেরা এই স্কুলটিকেই তাদের পোষ্যদের জন্য পছন্দ করে থাকে।

আতোয়ার-চপলা দম্পতিও তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে এই বিদ্যালয়েই ভর্তি করে দেয়। সজ্জনদের সাহায্য সহযোগিতায় মেয়ে দুইটা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের লেখাপড়া। মহানগরের উপকন্ঠে এবং চিনিকলের কাছে অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে শ্রমজীবী কর্মজীবী পেশাজীবী মানুষের সন্তানেরাই পড়াশুনা করে। বিদ্যালয়ের অনেক সমস্যা, শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় অনেক উপকরণের অভাব। ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ্য এবং পাঠ্য বিষয় বহির্ভূত শিক্ষায় শিক্ষিত ও পারদর্শী করে তুলতে হলে অনেক উপকরণ ও অর্থ প্রয়োজন। অভিভাবকেরা গরিব ও প্রতিপত্তিহীন তাই তাদেও পক্ষে এ বিষয়ে সাহায্য সহযোগিতা করার আগ্রহ থাকলেও উপায় নাই। যাদেরও এরূপ সাহায্য ও সহযোগিতা করার ক্ষমতা ও সুযোগ আছে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ ও দয়া যাঞ্চা করাই সমস্যা নিরসনের একমাত্র পথ বলেই বিবেচিত হয়।

ডংকা বেজে উঠলো এইরূপ একজন ক্ষমতাধর ব্যক্তি মহানগরীতে শুভ পদার্পন করবেন। তাঁকে খুশী করতে পারলেই তার মনে সদিচ্ছার উদয় হবে , তা হলেই খুলে যাবে অভাব-অনটনজনিত সমস্যার জট। শুরু হয়ে গেল……মহোদয়কে খুশী করার প্রক্রিয়া। কৌশল হিসেবে নির্ধারিত হলো অভ্যর্থনা ও আপ্যায়নের পথ। এ পথ দিয়ে এগুতে গেলেও দরকার টাকা।…..মহোদয়কে আপ্যায়ন সেতো যা তা কথা নয়।চর্ব-চোষ্য-লেহ্য-পেয় দিনে তাদেরকে সন্তুষ্ট করতে হবে। জবেহ করতে হবে একাধিক খাসী এবং তার গোশত দিয়ে রান্না করতে হবে কোর্মা, শতাধিক তুর্কী মুরগীর গোশতের রেজালা সবই রাখতে হবে খানার টেবিলে। একটু ত্রুটি-বিচ্যূতি হলে , পান থেকে চুন যদি খসে পড়ে তা হলে হিতে বিপরীত হতে পারে। সাহেব তো একা আসেন না, সাথে মোসাহেবরাও থাকেন। সাহেবের সাথে খুশী করতে হবে মোসাহেবদেরও।

সবদিক সতর্ক দৃষ্টি রেখেই গ্রহণ করা হলো কার্যক্রম। প্রয়োজনীয় অর্থ দেবে ছাত্র-ছাত্রীগণ। প্রাকারান্তরে দায়ভার চলে গেলো অবিভাবকদের কাঁধে। ছাত্র-ছাত্রীদের মাথাপিছু চাঁদা নির্ধারিত হলো টাকা ৩০০/০০ (তিনশত) মাত্র। আতোয়ার-চপলা দম্পতিকে তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলের জন্য দিতে হলো মোট টাকা ৯০০/০০ ( নয়শত) মাত্র। অভাবজনিত টানাটানির সংসার থেকে এই টাকা একবারে দিতে অনেক কষ্ট হলো তাদের। দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় অনেক কাট-ছাঁট করতে হলো। এভাবে ছাত্র-ছাত্রী (মূলত অভিভাবক)দের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থে দিয়ে…..মহোদয় ও তাঁর মোসাহেববর্গকে প্রহরে প্রহরে হরেক রকম সুদৃশ্য ও সুস্বাদু খাদ্য দ্বারা আপ্যায়ন করা হলো।

আপ্যায়িতরা কি এসব খাদ্য গ্রহণ করার আগে একবারও বিবেচনা করে দেখেছেন এসব খাদ্য কোথা থেকে এসেছে! এটা পরিবেশনের জন্য সরকার অনুমোদিত বাজেট আছে কি না, এজন্য কত অভিভাবক পরিবারকে থাকতে হয়েছে অর্ধাহারে, ক্ষেত্র বিশেষে কাউকে কাউকে কার্যত অনাহারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি এই ভাবে চাঁদা ধার্যেও আগে কি জেলার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এসব কথা একবারও বিবেচনা করে দেখেছেন, তাদেও বিবেকবোধ কি একবারও এসব বিষয় চিন্তা করে সক্রিয় হয় নাই।? অনেক ব্যথা ও অসহায়ত্ব নিয়ে আতোয়ার ও চপলাতাদের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু আল্লাহ ব্যতীত এসব বিষয় শুনে কার্যকরী প্রতিকার দেবার মতো কাউকে তো তারা পায় নাই।

যারা প্রতিকার ও প্রতিবিধান করতে সক্ষম তারা তো ব্যস্ত থাকেন নিজেদের চেয়ারটা আরও কত সুখকর করা যায় সেদিকে। তাই এই দম্পতির মতো অন্যরাও নিরুপায়। ইনারাই এসবের আয়োজন করেন, কর্তৃপক্ষের নেক-নজর পাবার আশায়। আয়োজিত অনুষ্ঠানের খরচের দায়ভার চাপিয়ে দেন অভিভাবকদের উপরে। কেউ সবিনয়ে আপত্তিকারীকে বলে সরাসরি বলে দেন ‘আপনার পোষ্যকে তাহলে এই বিদ্যালয় থেকে নিয়ে যান’। এরপর তো অভিভাবকের পক্ষে আর এগুনো সম্ভব হয় না। আপন মনে ফরিয়াদ জানায় আল্লাহর কাছে। প্রটোকলের দায়িত্ব ডেপুটি কমিশনার সাহেবের, যে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ঐ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপর যখন আপ্যায়নের দায়িত্ব অর্পণ করা তখন তারাও কি ভেবে দেখেন এসব আপ্যায়নের দায়িত্ব অর্পণের ফলাফল কিরূপ হতে পারে ! ?

শ্রমজীবীকর্মজীবী পেশাজীবীরা নিম্ন আয়ের মানুষ ভবিষ্যতের চিন্তা করে নিজেদের সন্তানদের শিক্ষিত করতে চায়। মফস্বলে তাদের সে সুযোগ নাই। এক-কেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থায় তারা পদে পদে অসহায়।…..মহোদয়গণ আসেন অনেক মূল্যবান কথা বলেন কিন্তু এই জনগোষ্ঠির সন্তানদের শিক্ষার সুযোগের কোন উন্নতি হয় না। তবুও তাদের সম্বর্ধনা দিতে হয়, আপ্যায়ন করতে হয়।. …..মহোদয় আপ্যায়ন আর উপঢৌকনে তুষ্ট হলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তামন্ডলী পদোন্নতি পান, সুবিধাজনক পদে পদায়িত হন কিন্তু প্রতিষ্ঠান তো কিছু পায়না। অভিভাবক ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের আশায় থাকেন। সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। প্রতীক্ষার পালা শেষ হয় না। ছাত্র-ছাত্রীদের ছাত্রত্ব শেষ হয়ে যায়। তারা প্রবেশ করে বেকার জীবনে। নতুন ছাত্র-ছাত্রীরা আসে, ঘটতে থাকে অতীতের পূনরাবৃত্তি। এক কেন্দ্রীক শাসন ব্যবস্থার ঘোরপ্যাঁচে মফস্বলের জনগণকে এভাবেই আশা আর আশাভঙ্গের দোলাচলের মাঝেই কাটাতে হচ্ছে জীবন। এইভাবেই চলছে, চলবে !

লেখকঃ সাবেক জেলা ও দায়রা জজ।

Facebook Comments
SHARE