জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে কি বিশ্বাস করা যায়?

270

ইমরান হোসাইনঃ পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে চাঁদ ও সূর্যকে প্রায় একই রকম দেখা গেলেও চাঁদ ও সূর্যের অবস্থানগত পার্থক‍্যের পাশাপাশি তাদের বৈশিষ্ট্য ও শক্তিমত্তার পার্থক্য বিস্তর। তেমনি দূর থেকে বা অরাজনৈতিক ব‍্যক্তিদের নিকট বিএনপি ও আওয়ামী নামক দুটো দলকে একই রকম মনে হলেও দল দুটোর নৈতিক শক্তি ও লিপিবদ্ধ আদর্শে রয়েছে যোজন দূরত্ব। অনুরূপে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার মাঝে মানবিক গুণ, আচরণগত বৈশিষ্ট্য ও দেশপ্রেমে রয়েছে বিস্তর তফাৎ।

অর্থনীতিতে ব‍্যাংক অব সুইডেন অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী (অর্থনীতিতে নোবেল পুরষ্কার নেই) অমর্ত‍্য সেন তাঁর The Idea of Justice এ যেটাকে বলেছেন-“অবস্থানগত বিভ্রম ন‍্যায‍্যতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাঁধার সৃষ্টি করতে পারে”। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রায় অশিতীপর বৃদ্ধা বেগম খালেদা জিয়ার ত‍্যাগের সাথে অন‍্য কোন কিছুরই তুলনা হতে পারে না।

বিখ্যাত ফরাসী কবি শার্ল বোদলেয়ার যেমন করে বলেন-“Modernity does not relate to any time. It’s an attitude. প্রত‍্যেক যুগে যেমন কিছু আধুনিক মানুষ থাকে,থাকে কিছু অনাধুনিক ও বর্বর মানুষ। তাইতো প্রায় প্রতিটি ধর্মেই শয়তানি শক্তিকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। আবেস্তা,রা বা জান্দায় যেমন করে বলা হয়েছে-ফুলের মধ‍্যে কাঁটা,আগুনে ধোঁয়া বা ফলজ বিষ সবই শয়তানি শক্তির প্রতিভূ। তবে শেষ বিচারে সত‍্য শক্তি অবিনাশী। বেনেতো মুসোলিনি মার্চ করে স্বল্প বিপ্লবে শাসন ক্ষমতায় এসেছিলেন। হিটলার কোয়ালিশন সরকারে ভোটের মাধ্যমেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।

আজাজীল ফেরেশতা ছিলো, সে শয়তান হয়ে গেলো। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শেখ হাসিনারও কম-বেশী অবদান নিশ্চয়ই ছিলো। এখন তিনি সেরা ৫-এ আছেন। যে প‍্যাঁচার রাত জাগা চোখ দিনের আলোতে অন্ধ,সে উন্মোচন করতে পারে না আলোর রহস‍্য। সূরা ইয়া-সীনে আল্লাহ পাক যেমন করে বলেছেন, হয়তো গলায় বেঁড়ি পরানো হয়ে গেছে। তিনি রাস্তায় হাঁটার সময় সোজা হয়ে হাঁটেন, আর নীচের দিকে তাকাতে পারেন না। তাই তাঁর গর্তে পরে যাওয়া অবশ‍্যম্ভাবী। হারানো গণতন্ত্র ফিরে পেতে হয়তো সময়ের অপেক্ষা। একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবেতো বটেই,দেশের একজন নাগরিক হিসেবেও কেউ তাঁর দায়িত্বকে অস্বীকার করতে পারেন না।

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দশকে ইতালীতে জন্ম নেয়া ইহুদী পুত্র পিয়েরো এন্জেলো স্রাফা শুধু অল ইউরোপ নয়,অল ওয়াল্ড কন্টেক্সেটে শ্রেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক ছিলেন। ১৯২২ সালে মুসোলিনি ক্ষমতা গ্রহনের দু’বছরের মাথায় স্রাফা ইতালীয় কমিনিষ্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মহাত্মা আন্তোনিও গ্রামসীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন- ফ‍্যাসীবাদ মোকাবেলায় অনেক কিছু ছাড় দিয়ে হলেও ইতালিয় সোস‍্যালিষ্ট পার্টি সহ অপরাপর সকল রাজনৈতিক দলকে নিয়ে একটি বৃহৎ ঐক‍্য গড়ে তোলার জন‍্য। কিন্তু ১৯২১ সালে সোস‍্যালিষ্ট পার্টি ভেঙ্গে অ্যামিদিও বর্দিগা ও গ্রামসীর নেতৃত্বে গড়ে উঠে কমিউনিষ্ট পার্টি।

সোস‍্যালিষ্টদের সাথে মূলতঃ ব‍্যক্তিগত বিরোধের কারণে গড়ে উঠেনি বৃহৎ গণঐক‍্য। পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে লেনিনের সাথে রাশিয়াতে একান্ত গোপন বৈঠকেও বিষয়টি আলোচিত হয়। কিন্তু অ্যামিদিও বর্দিগা সোস‍্যালিষ্টদেরকে ফ‍্যাসিষ্টদের দোসর নব‍্য ফ‍্যাসিষ্ট বলে আখ্যায়িত করে বৃহৎ ঐক‍্যের বিরোধিতা করেন। গ্রামসী ১৯২৬ সালে মুসোলিনির কারাগারে যাওয়ার পর ১৯২৮ সালে তিনি তাদের ভুলটা বুঝতে পারেন। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ফ‍্যাসীবাদ মোকাবেলায় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বৃহৎ ঐক‍্য গড়ে তোলার নিমিত্তে আজ থেকে প্রায় দেড় বছর আগে থেকেই আভ‍্যন্তরীণভাবে কাজ চলেছে। যার সফল পরিনতি হলো প্রায় এক মাস আগে। কারাগার থেকে জাতীয় ঐক‍্যফ্রন্টের নেতৃত্ব মূলত দিচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর অনুপস্থিতিতে ডিফেক্টো হিসেবে আছেন ঐক‍্যফ্রন্টের বয়োঃজৈষ্ঠ‍্য নেতা ডঃ কামাল হোসেন ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

আমার অনেক সহকর্মীরাই ব‍্যক্তিগত আলাপ আলোচনায় প্রশ্ন তুলেন, জাতীয় ঐক‍্যফ্রন্টের ৯৯.৯৯ ভাগ জনসমর্থন যেখানে একক ভাবে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের সেখানে বাকীদের এত গুরুত্ব দেয়ার কি মানে আছে?? তাদের সবিনয়ে বলবো,ব‍্যক্তিগত যোগ্যতা ও যশ খ‍্যাতি যেমন সংগঠনকে সমৃদ্ধ করে,ঠিক তেমনি সংগঠনের বিশাল ব‍্যাপ্তি ও পরিধিগত বিপুল জ্ঞান ভান্ডার ব‍্যক্তিকে পুষ্ট করে। এই দু’য়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠে সংগঠন।

আপনাদের এতদসংক্রান্ত স্মরণ করিয়ে দেই,আজ থেকে প্রায় ৫ হাজার বছর পূর্বে (মতান্তর আছে) ঋষি বেদব‍্যাস তাঁর মহাভারত কাব‍্যগ্রন্থ লিখেছিলেন। সেখানে কুরুর যুদ্ধে বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণ শর্ত দিয়েছিলেন তিনি এবং তাঁর অজেয় নারায়ণী সেনা এক পক্ষে যুদ্ধ করবেন না। তিনি আরও বলেছিলেন তিনি যুদ্ধে কোন অস্র ধারণ করবেন না। ধৃতরাষ্ট্র পুত্র দূর্যোধন ও তার শত ভ্রাতা অজেয় নারায়ণী সেনাকে বেছে নিয়েছিলেন আর পান্ডব পুত্র বুদ্ধিমান অর্জুন বেছে নিয়েছিলেন বিষ্ণুবতার কৃষ্ণকে। যুদ্ধে কৃষ্ণ তাঁর অপরিসীম বুদ্ধিমত্তা ও ব‍্যক্তিগত যোগ‍্যতা দিয়েই পান্ডব পুত্রদের জয় নিশ্চিত করেছিলেন। দয়া করে কেউ আমাকে ভুল বুঝবেন না,আবার এই ৪-৫ জন নেতার উপর খুব বেশী আশাবাদীও হবেন না। তবে ইতিহাস থেকে একটি কথা আপনাদের স্মরণ করিয়ে দেই।

সমরখন্দ জয় করার পর চেঙ্গিস খান তাঁর জৈষ্ঠ্য পুত্র জুচিকে সেখানকার শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। মাহমুদ ইয়ালভাচ্ ছিলেন চেঙ্গিসের দোভাষী ও বিশ্বস্ত উজির। হাজী রহিম নামক একজন দূধর্ষ যোদ্ধা, জ্ঞানী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হেকিম ছিলেন এক সময়ে চেঙ্গিসদের বিরোধী শক্তির অমাত‍্য। জুচি তাঁর পুত্র বাতু খাঁর জন‍্য একজন উপযুক্ত শিক্ষক চেয়েছিলেন মাহমুদ ইয়ালভাচ্ এর নিকট। মাহমুদ,হাজী রহিমকে একটি চিঠি লিখে পাঠালেন জুচির কাছে। পুত্রের শিক্ষকের জন‍্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ পিতার নিকট একজন আগন্তুক আসলেন। জুচিকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে আগন্তুক বল্লেন-আমি হাজী রহিম, আপনার একান্ত বিশ্বস্ত মাহমুদ ইয়ালভাচ্ আমাকে নিজ হাতে লেখা একটি চিঠিটি দিয়ে পাঠিয়েছেন। দু’চোখ বড় তাকালেন জুচি আর বল্লেন এত দেরি কেন?? তাড়াতাড়ি চিঠিটা দাও। চিঠিতে এক লাইনে লেখা-“এঁকে বিশ্বাস করবেন”।

আমিও বলবো এদের বিশ্বাস করুন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে বিশ্বাস করুন, বিশ্বাস করুন কারাগারের বেগম খালেদা জিয়াকে, তার নেতৃত্বকে; জাতি আবার ঘোরে দাঁড়াবে। যারা এতদিন মুখ বুঝে সহ্য করেছেন, নীরবে একটি বুথে একবার নীরব প্রতিবাদ করে আসুন, না হয় শেষবার বিশ্বাস করলেন ঐক্যফ্রন্টকে, বেগম জিয়ার নেতৃত্বকে।

Facebook Comments

Hits: 19

SHARE