জাতীয় ঐক্য বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় … (৫)

63

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ অবশেষে খানাপিনার সাথেই গণভবনে অবৈধ সরকারের সাথে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ শেষ হয়েছে। যদিও সংলাপে কি হতে পারে বুঝেই বিএনপির গয়েশ্বর রায় সংলাপে যোগ দেন নাই। সংলাপ শেষে দলনেতা ডঃ কামাল হোসেন আলোচনা ফলপ্রসূ হবে বললেও বিএনপি মহাসচিব তার অসন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন মিডিয়াকে।  রাজনীতিতে এই সংলাপ নামের নাটক হচ্ছে একপ্রকার ধোঁকাবাজির খেলা যা অতীতেও হয়েছে। আর এই খেলায় কে যে কার বিরুদ্ধে খেলছে, কি খেলছে; সেটাও যে আদৌ কেউ বুঝছে কিনা সেটাই এখনো বুঝতে পারছি না আমি না জনগণ।!

সংলাপ হলেও আসলে সংলাপটি কেন হয়েছে সেটি কিন্তু আজো জাতির সামনে পরিস্কার নয়। ঐক্যফ্রন্ট ৭ দফা দিয়েছে, এই দফাগুলোর প্রতিটি ইস্যু নিয়ে গত ১০ বছর কম বেশি আন্দোলন হয়েছে, হাজার হাজার প্রান গিয়েছে, নিখোঁজ হয়েছে; কিন্তু এতোটুকু নড়েনি সরকার। সেই অবস্থায় নির্বাচনের পূর্বে এই সংলাপে কি পাওয়া যাবে সেটি কারোই বোধগম্য হয়নি; উল্টো সরকার শেষ বেলায় এসে নিজের বৈধতাকে পূর্ণতা দিতে সক্ষম হল মাত্র। এর দায় থেকে বিএনপিও মুক্ত হতে পারবে না।

বিদেশী একটি মিডিয়া লিখেছে, সংলাপের অর্জন হচ্ছে এটি পণ্ড হয়ে যায়নি।  আওয়ামী লীগের ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘‘আলোচনার দরজা খোলা আছে৷ তবে মূল দাবি নিরপেক্ষ নির্বাচনী সরকার, সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে কোনো সাড়া মেলেনি সরকারের দিক থেকে৷ এরমানে বুঝতে কি রাজনীতিতে পিএইচডি করা লাগে? নাকি এটাই হবে বুঝতে পণ্ডিত হওয়া লাগে? আসলে সকল দলের নেতারা নির্বাচনের আগেই সংলাপ করে শেখ হাসিনার চক্ষুলজ্জা ধরাতে গিয়েছিল, যাতে ওনারা এখন আর কেউ গ্রেপ্তার না হন। কিন্তু শেখ হাসিনার যে ঐ চক্ষু লজ্জা জিনিসটা একেবারেই নেই; সেটা জাতি জানলেও নেতারা জানেন না।

আপনি দাবী জানাবেন অবৈধ সরকার যেন সরে গিয়ে নিরপেক্ষ সরকার বানিয়ে নির্বাচন দেয়, দাবি আদায়ের ক্ষমতা নেই, তাই যার বিরুদ্ধে দাবী তার কাছে আর্জি নিয়ে গেলেন, তুমি বাবা বা মা চলে যাও, আমরা নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাবো। আর তোমাদের কাছে আটক ও কৌশলে সাজা দেয়া আমাদের নেত্রীকে মুক্তি দিয়ে দাও, ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার মাথায় ধরে না এ দাবী কেন মানবে শেখ হাসিনা? কোন গর্তে পড়েছেন তিনি যে ৭ দফা মেনে নিয়ে তাকে নির্বাচন দিতে হবে? এমন কোন শক্ত কাজটি আমরা বিরোধীরা করতে পেরেছি যে শেখ হাসিনা সুরসুর করে সব দাবী মেনে নিবেন? এটা তো গোবর গনেশেরও বোঝার কথা।! এতো কষ্ট করে ধাপ্পাবাজি দিয়ে যে সংবিধান বানিয়েছেন, সেটা এতো তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে ফেলবেন এটা ভাবাটাও তো একপ্রকার গাধার মত ভাবনা নয় কি?

বিএনপি নাকি ডিনার খাবে না! কত প্রচার! আরে বাবা একটা আলোচনায় গেলে সেখানে আপ্যায়ন হবেই, সেটি কি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের আলোচনায় গেলে বর্জন করা যায়? বিএনপিতে এখন এমন লোকে সয়লাব। আরে বাবা আপনি কি মাওলানা ভাসানির মত চরিত্রের নেতা পেয়েছেন নাকি যে এমন কিছু ঘটেও যেতে পারে? আসলে খালেদা জিয়ার মুক্তি, নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার বা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের যে দাবি তাতে সরকার সাড়া দেয়নি৷ ফলে এই সাড়ে তিন ঘণ্টার সংলাপে কোনো ফল নেই এটাই সরল সোজা কথা।

এখন কথা হচ্ছে, সংলাপ সং-আলাপে রুপান্তরের পরে কি ঐক্যফ্রন্ট আন্দোলন করতে পারবে? বিএনপির শক্তির সাথে কি এমন শক্তি যোগ হয়েছে যে আন্দোলন করা সম্ভব হবে? আর নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা দিলে আন্দোলন নামের জিনিসটি তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না। সারা দেশে যে সকল গ্রামীণ রাজনৈতিক টাউট বাটপার পুঁজিবাদী রাজনীতিতে জন্ম নিয়েছে বিগত কয়েক দশকে, তারা নির্বাচনী খাওয়া বাদ রেখে আন্দোলন করতে দেবে এটাই বা ভাবি কিভাবে?

হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদ সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন এই সংলাপ সফল হবে না।  সংলাপের ইতিহাস ঘাঁটলেও পাওয়া যায় ১৯৯৪ সালের ৩১ আগস্ট রাজনৈতিক সংকট নিয়ে সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল আওয়ামী লীগের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল৷ তখনকার কমনওয়েলথ মহাসচিব এনিয়াওকুর এমেকা ১৩ অক্টোবর ঢাকায় এসে দুই নেত্রী  শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেন৷ কমনওয়েলথ মহাসচিবের মধ্যস্থতায় রাজনৈতিক সংকট নিয়ে সংলাপে দুই নেত্রী আনুষ্ঠানিক সম্মতিও দিয়েছিলেন৷ পরে সেটিও সফল হয়নি৷ পরে তারই বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিপৈনকে আসলেও ফলাফল শুন্য।

এরপর বিএনপির মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের মধ্যে প্রায় তিন সপ্তাহব্যাপী সংলাপ হয়েছিল নির্বাচনকালীন সরকারের ইস্যুতে৷ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিএনপির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ২৯ দফা তুলে ধরা হয়৷ ওই সময় মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের মধ্যে ছয় বার বৈঠক হলেও ফল শুন্য ছিল৷

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের শেষ দিকে নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে বসে বিএনপি৷ সংকট নিরসনে জাতিসংঘের অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তিনবার ঢাকায় এসে দু’ পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেন৷ আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক এবং বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বে সরকার ও বিরোধী দলের বৈঠক হয়েছিল ১০ ও ১১ ডিসেম্বর যেখানে উপস্থিত ছিলেন তারানকো৷ পরের বৈঠক হয় জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকারের উপস্থিতিতে৷ কিন্তু কোনো সংলাপই সফল হয়নি৷ সামনের দিনগুলোতে সম্ভাবনাও প্রশ্নবোধক! (চলবে)

লেখকঃ রাজনীতি, আইন ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

Facebook Comments
SHARE