জাতীয় ঐক্য বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় …(১)

108

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ পুরো রাজনীতিকে ধ্বংস করে, জাতির সাথে তামাসা করা জগদ্দল পাথর সরকারের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য হয় হয় করেও অবশেষে যা হয়েছে তার উপরে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে। যদিও এই প্রথমবারের মত বিশাল বিএনপি অন্য কারুর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যে সামিল হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া জেলের বাইরে থাকলে বা তারেক রহমান দেশের ভেতরে থাকলে অন্য কারো নেতৃত্ব বিএনপি জোটের এমনতর ঐক্যে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা ছিল শুন্যের কোঠায়। আদর্শ ও বিশ্বাসের জায়গাটি গুটিয়ে রেখে এই ঐক্য এগিয়ে নিতে পারলে জাতি হয়তো রক্ত পিপাসুদের বিরুদ্ধে মাঠে নামবে। 

তবে এরপরেও পুরো বিষয়টি নিয়ে কেন যেন কিছু যোগ বিয়োগ করে দেখতে ইচ্ছে করে। জাতীয় ঐক্য হয়েছে নির্বাচনকে সামনে রেখে। ঐক্যজোট ৭ দফা দিয়েছে নির্বাচনে যাওয়ার শর্ত হিসেবে; কিন্তু ৭ দফা না মানলে ঐক্যজোট নির্বাচনে যাবে কিনা সেটি এখনো পরিস্কার নয়। এদিকে তফসিল ঘোষণার আর খুব বেশি বাকি নেই। যদি ধরেও নেই, সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলো, কিন্তু ঐক্যজোটের ডাকে বিশাল আন্দোলনের কারনে নির্বাচন বাধাগ্রস্থ হলো; তখন কি হবে? সরকার কিন্তু এটি আগে থেকেই জানতো; তাই তারা সংবিধানে তাদের আগের সংসদ বহাল থাকার বিধান রেখেই দিয়েছে। তাই তারা আর অবৈধ হবে না। আর আমরাতো এমনিতেই তাদের সরকার মেনেই সবকিছু করছি; তাদের উৎখাত করার তো কোন ডাক দেই নাই!

আমি আগেই লিখেছিলাম, নির্বাচন আসার প্রাক্কালেই শেখ হাসিনা মানুষের মধ্যে ত্রাস ও ভীতির সঞ্চার করাবেন বিভিন্ন ভাবে নাগরিক হত্যা করে, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের অপদস্ত ও কারান্তরিন করে। সেটি কিন্তু যথাযথ শুরু হয়েছে ঐক্যের আগে থেকেই। এখন আমরা ভিন্ন একটু দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বিচার করি তবে ভিন্ন একটি ছবি সামনে আসবে। অনেকের মত ভাবতে চাই ‘ভারত’ সরকার এখন আর হাসিনার পক্ষে নাই; কিন্তু না থাকলে কেন নাই?  এর বৈদেশিক কারনে না গিয়ে আঞ্চলিক কারন দেখলে দেখবো ভারত শেখ হাসিনার উপর আর রিস্ক নিতে চাচ্ছে না; কারন এতে যে কোন সময় তার স্বার্থের বিনাশ ঘটতে পারে। বাংলাদেশের সমতল ভুমি হাতছাড়া হয়ে গেলে তার বাজারতো যাবেই, ভারতের অখণ্ডতাই পুরো ভেঙ্গে পড়ার ঝুঁকির ক্ষেত্র তৈরি হয়ে যাবে। তো ভারত সেটি ঠেকাতেই মাঠ নিজের মত সাজাবেই। সেই সাজানোর সুত্রে তারা বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠিয়ে বিএনপির জাতীয় নেতৃত্বকে এতিম করে দিয়েছে।

তারেক রহমান দলের মধ্যে তরুন অংশের কাছে জনপ্রিয় হলেও দলের একটি শক্তিশালী অংশের কাছে অপ্রকাশ্যে অজনপ্রিয়; এটাই সত্যি। আর জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে এই মুহূর্তে দেশে থাকলেও অন্তত ডঃ কামাল হোসেন বা তার সমসাময়িকদের মত নেতৃত্ব কেউই তার নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য করতে সামিল হতো না এটাই সত্যি। এটা ইগো বা আভিজাত্য যাই হোক এটাই সত্যি; যা কেউ বলেনা আমি লিখেই দিলাম। তো ভারত বিরোধী রাজনীতিকে এখন ভারতের ও তাদের বন্ধুদের কাছেই বন্ধক দেয়া হয়েছে; যে কারনে নির্বাচনে অংশ নিলেও যদি ঐক্য সরকার হয় সেখানে বাংলাদেশী জনগোষ্ঠীর স্বার্থ কতখানি সংরক্ষণ হবে সে ব্যাপারে আমি পুরোটাই সন্ধিহান।

এখন আসি শেখ হাসিনার স্ট্র্যাটেজিটা কি আসলে সেটি বুঝতে। হাজার হাজার নাগরিক হত্যা ও গুম করে একজন মহিলা লাগাতার ক্ষমতায় বসে আছে এবং ২১০০ সাল পর্যন্ত পরিকল্পনা করেছেন সেই মহিলাকে সবার ইচ্ছে হলো আর ক্ষমতা নিয়ে নেয়া গেল সেটি ভাবা বোধহয় ঠিক না। ভারত যে কোন সময় তার সমর্থনের প্রশ্নে ডিগবাজি দিতে পারে সেটি আমি বুঝলে হাসিনা বুঝবে না এটা বোঝাও পাগলামি। সেটা বুঝেই শেখ হাসিনা গং অত্যন্ত সু কৌশলে কয়েকটি কাজ করে রেখেছেন যা তার রক্ষা কবচ হবে বলেই অন্তত তারা বিশ্বাস করেন। সেগুলো হচ্ছে, (১) ৮০,০০০ সশস্ত্র পুলিশে দলীয় ক্যাডার নিয়োগ, (২) পুরো প্রশাসনে ৩ স্তরে দলীয় ক্যাডার নিয়োগ, (৩) শিক্ষা বিভাগে দলীয় নিয়োগ যারা পোলিং অফিসার হিসেবে কাজ করবে, (৪) বিচার বিভাগের চরিত্র নষ্ট করে দেয়া, যাতে কেউ সুবিচার না পেতে পারে। (৫) পুরো প্রতিরক্ষা বাহিনীকে দুইটি ধাপে উন্নিত করা (ক) প্রচুর ব্যবসা বানিজ্যের কর্পোরেট সুবিধা প্রদান এবং (খ) ভাড়াটিয়া বাহিনীতে পরিনত করন (৬)  দলীয় লোকদের অবাধ লুটপাটের সুযোগ করে দেয়া, যাতে এই লাখ লাখ দলীয় লোকজন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই সরকার বহাল রাখতে প্রাণপণ লড়াই করবে, নইলে এদের ভিটে মাটি ছাড়া হতে হবে।  এবং ফাইনালি বিদেশে বিএনপি যে সকল বন্ধু রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল তাদের সাথে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তোলা।

শেখ হাসিনা গং এই বিষয়গুলো সুবিন্যস্ত ভাবে গড়ে রেখেছেন নিজেদের রক্ষায়, এখন ভারত ইচ্ছে করলেই তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিতে সক্ষম হবে সেটি ভাবার অবস্থানে সরকার নেই এটাই বাস্তবতা। কিন্তু এরপরেও অহংকারীর পতন হয়ই, হবেও, সেটি পরবর্তী কিস্তিতে।  (চলবে)

লেখকঃ রাজনীতি, আইন ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

Facebook Comments
SHARE