গোলামতন্ত্র মানবেন? নাকি জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে মুক্তির পথ বেছে নেবেন?

57

এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামানঃ ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলামের কাছে আওয়ামী লীগের ভাষায় বললে ‘নালিশ’ করতে যান শেখ হাসিনা। দুই ঘন্টার নালিশে তিনি তৎকালীন বিএনপি সরকার, যারা মাত্র ছয় মাস আগে দায়িত্ব নিয়েছিলো তাঁদের বিরুদ্ধে হেন কথা নাই, যা বলেন নাই।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটা তিনি বলেন তা বর্ণিত আছে যুক্তরাষ্ট্রের নথিতেঃ “SHEIKH HASINA SPENT A CONSIDERABLE AMOUNT OF TIME EXPLAINING WHY THE PARTY’S CALL FOR SOCIALISM WAS REALLY NOT/NOT A CALL FOR SOCIALISM. SHE SAID THAT SHE PERSONALLY HAD NO SYMPATHY FOR SOCIALISM, THAT SHE KNOWS THAT IT IS A FAILED SYSTEM, EVERYWHERE.”

আমরা যারা বাংলাদেশের রাজনীতির খোঁজ খবর রাখি, তারা ভালো করেই জানি আওয়ামী লীগের ঘোষিত চার মূলনীতির কথাঃ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা আর বাঙালী জাতীয়তাবাদ।

গণতন্ত্রের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের অবস্থান সর্বজনবিদিত, ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে ভোট ডাকাতির নির্বাচন থেকে আওয়ামী লীগ আর গণতন্ত্র দুটি দুই পথে। যার প্রমাণ তারা দিয়েছে ১৯৮২ সালে এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানিয়ে, ১৯৮৬ সালে এরশাদের পাতানো নির্বাচনে অংশ নিয়ে, ১৯৯৬ সালে নাসিমকে দিয়ে সামরিক ক্যু করানোর চেষ্টা করে, ১৭৩ দিন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে পরে ২০১১ সালে নিজেরাই তা সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে, এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী ভোটার বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে অর্ধেকেরও বেশি প্রার্থীকে বিনাভোটে নির্বাচিত করে।

সমাজতন্ত্র যে হাসিনা মানে না সে কথা তো নিজ মুখেই স্বীকার করে নিয়েছেন, গণতন্ত্র মানেন না তা কাজে প্রমান করে দেখিয়েছেন।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটা এক্সক্লুসিভ জাতীয়তাবাদ, তাই তাদের নিজেদের আদালতই এই জাতীয়তাবাদকে খারিজ করে দিয়েছে; ফলস্বরূপ টিকে আছে জিয়াউর রহমানের দেয়া বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ।

আর ধর্মনিরপেক্ষতা কি জিনিস, খায় না মাথায় দেয়, তাই-ই জানে না শেখ হাসিনা, জানলে তার এতটুকু ধারণা থাকার কথা যে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ঘোষণা করে মসজিদ-মাদ্রাসা বানানোর জন্য ছয় কোটি সরকারি অনুদান দেয়া পরষ্পরবিরোধী এবং কাবা ঘর তাওয়াফ করার সময় উলুধ্বনী দেবার বা দূর্গা দেবী গজে চড়ে আসার তথ্য দেয়া হাস্যকর।

তাহলে আওয়ামী লীগের নীতি কি?

আওয়ামী লীগের একমাত্র নীতি হচ্ছে গোলামতন্ত্র। এই গোলামতন্ত্রে শেখ পরিবার হচ্ছে সর্বশক্তিমান এক রাজ পরিবার, আর আওয়ামী লীগের প্রতিটি নেতা-কর্মী এই পরিবারের গোলাম।

আওয়ামী লীগের নেতা, পাতি-নেতা কিংবা তৃণমূলের একজন কর্মী হতে হলেও আপনাকে এই গোলামি স্বীকার করে নিতে হবে। আপনাকে মেনে নিতে হবে যে এই পরিবার এবং তাঁদের কৃতদাসেরা যা বলবে তাই-ই শুধু সত্য, বাকি সব মিথ্যা।

যেমন ধরুন তারা আপনাকে বলবে এসকে সিনহা একজন দুর্নীতিবাজ, কারণ সে মীর কাসেম আলীর ভাই এবং সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর পরিবারের কাছ থেকে টাকা খেয়েছে মীর কাসেম আলী ও সালাউদ্দিন কাদেরকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু আপনি প্রশ্ন করতে পারবেন না যে, যদি এসকে সিনহা টাকা খেয়েই থাকে তবে সে কেন মীর কাসেম আলী আর সালাউদ্দিন কাদেরের বিপক্ষে রায় দিল?

একমাত্র নিকৃষ্ট গোলাম ছাড়া কেউ এই দলের সাথে যুক্ত হতে পারবে না। এইটাই এই দলের একমাত্র নীতি। আর কোন নীতি নাই। আপনি যদি এই গোলামি মেনে নিতে না পারেন তাহলে আপনি আওয়ামী লীগ করতে পারবেন না। এইজন্য আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক শীর্ষনেতাদের ৬০-৭০ শতাংশ পরবর্তী জীবনে লীগ করতে পারে না। এই জন্য ডঃ কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মনসুর আহমেদরা আওয়ামী লীগ করতে পারেন না। আর ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে রাজপথে টিকিয়ে রাখা মোস্তফা মহসিন মন্টুকে গণফোরামে যোগ দিতে হয়; হেমায়েত উল্লাহ আওরঙ্গকে মৃত্যুর আগে বিএনপি’তে যোগ দিতে হয়, লিয়াকত-হান্নানকে হারিয়ে যেতে হয় আর মতিউর রহমান রেন্টুকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বই লিখে দেশান্তরী হতে হয়।

আজকে বাংলাদেশের যে সংকট, এর অন্যতম প্রধান কারণ এই গোলামতন্ত্র। আওয়ামী লীগ মনে করে তাঁদের সাম্রাজ্যে সবাইকে তাঁদের গোলাম হতে হবে। তাই লজ্জাজনক পরাজয়ের পর তাদেরই মনোনীত প্রেসিডেন্ট শাহবুদ্দীন আহমেদকে এরা গালাগালি করবে, কেন সে ২০০১ সালে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে বাতিল ঘোষণা করলো না।

একই কারণে নিজেদেরই মন্ত্রী একে খন্দকার যখন যুক্তি-তর্কের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে দেন যে শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দেন নাই, তখন সে যত বড় মুক্তিযোদ্ধাই হোন না কেন, তাঁকে রাজাকার বলতে দুই সেকেন্ডও সময় লাগে না শেখ হাসিনার।

আজকে এসকে সিনহার হাসিনার প্রিয়পাত্র থেকে চিরশত্রুতে পরিণত হওয়ার পেছনেও দায়ী এই গোলামতন্ত্র। বিচারপত্রি সিনহা যখন সাগর-রুনীর হত্যার বিচার করতে চেয়েছেন, তনু হত্যার বিচার করতে চেয়েছেন, বেসিক ব্যাংকের টাকার হদিস জানতে চেয়েছেন, বিচারকদের উপর আইনমন্ত্রীর খবরদারি বন্ধ করতে চেয়েছেন, ডিজিএফআই দিয়ে রায় লেখানো বন্ধ করতে চেয়েছেন- তখন শেখ হাসিনা আর মেনে নিতে পারেন নাই।

কারণ শেখ হাসিনা ভালো করে জানেন যে কেঁচো খুড়তে দিলে যে সাপ বের হবে, আর সেই সাপ দেখলে এই দেশের মানুষ আগামী একশো বছরে আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে না।

গতকাল নতুন ঐক্য প্রক্রিয়ার যে সূচনা হয়েছে, সেই ঐক্য প্রক্রিয়া হচ্ছে এই গোলামতন্ত্র ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ। বাংলাদেশকে এই গোলামতন্ত্র থেকে মুক্ত করতে না পারলে, আজ হোক কাল হোক আপনিও এদের গোলামে পরিণত হবেন নয়তো দেশ ছাড়তে বাধ্য হবেন।

সিদ্ধান্ত আপনার।

Facebook Comments
SHARE