তারেক রহমানের নেতৃত্বঃ সম্ভাবনা ও বাস্তবতা -৩

37

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ সম্প্রসারনবাদী শক্তির দালাল মুরিদে পরিনত কথিত পীরেরা তারেক রহমানকে নিয়ে যে কুৎসামূলক লেখাই লেখুক না কেন তা তারেক রহমানের দলীয় নেতৃত্ব লাভ বা নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন হলে তাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভে কোন অন্তরায় সৃষ্টি কিংবা নেগেটিভ কোন প্রভাবই ফেলতে সক্ষম হবে না। কেন হবে না এটি বিশ্লেষণের দাবী রাখে। নির্বাসনে থাকাকালে তারেক রহমান যাদেরই প্রবাসে রাজনীতির সামনে নিয়ে দেখান না কেন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনের পরে এদের ৯৯% শতাংশ বছরে একবারো তার সাক্ষাত লাভে সমর্থ হবে না বলে বাংলাদেশের নেতা কর্মীরা নিশ্চিত করেছেন।

এই অঙ্কটি কেন তা সমজদারদের বোঝানোর সরকার নেই। এটাই বাস্তবতা। প্রবাসীদের রাজনীতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোন অবদান রাখে না কিন্তু সহায়ক হয় সময়ে সময়ে যা কখনই নিয়ামক নয়। এটি তারেক রহমান ভালো করেই জানেন বলেই বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য প্রয়োজনীয় নেতা কর্মীদের তিনি সযতনে দূরে রেখে অনুল্লেখযোগ্যদের প্রবাসী রাজনীতিতে সামনে নিয়ে এসেছেন। তাদের দিয়েই সবকিছুর একটা কাভার দিয়ে রেখেছেন, যেন ভারতীয় তাবেদার সরকার বিভ্রান্ত থাকে সর্বদা। এটি রাজনীতির একটি অংক মাত্র।

বাংলাদেশের রাজনীতি ও সরকার পরিচালনায় তারাই সর্বদা সামনের কাতারে থাকবেন যারা দেশে থেকে নির্যাতন নিপীড়ন জেল জুলুম সহ্য করে দলকে আঁকড়ে থেকেছেন। এটির ব্যাত্যায় ঘটলে তারেক রহমানের রাষ্ট্র ক্ষমতা লাভ যেমন দুরুহ হবে; ক্ষমতা লাভ হলে টিকে থাকা হবে তার জন্য আরও আশংকাজনক। এটি তারেক রহমান জানেন। যদিও দেশীয় রাজনীতির মধ্যেও রয়েছে জাতীয় শত্রুদের ভয়ংকর এজেন্ট চক্র।

কেন তারেক রহমানকে আমি এতোটা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছি, এর কিছু ব্যাখ্যা দরকার। জাতীয়ভাবে জেনেটিক্যালি আমরা আমাদের শ্রেণী থেকে কোন নেতৃত্বকেই বেশীদিন মেনে নেই না। পাকিস্তান আমলেও এই একই কারনে মুসলিম লীগ ধংসের পথে চলে গিয়েছিল। আমরা এমন নেতা চাই তারা থাকবেন ধরা ছোঁয়ার বাইরের মানুষ। এমন মানুষ হবেন নেতা যার কথা বিনা বাক্য ব্যায়ে মেনে নেয়া হবে, থাকবে দলীয় ঐক্য। আর যে কারনেই তারেক রহমানের বিকল্প বিএনপিতে নেই। তা সে নেতা যেভাবেই প্রয়োজন এমনকি সামন্তবাদি নিয়মেও রাজনীতি চালাক না কেন, তাই হবে শিরোধার্য। জাতীয় ও দলীয় সকল চরিত্রেই আমাদের রয়েছে অগণতান্ত্রিক দৈন্যতার এমনতর চিত্র; যে কারনেই কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়নি, হবেও না। আওয়ামী লীগ এমনকি বিএনপিতেও যা রয়েছে। এজন্য বেগম জিয়া বা তারেক রহমান দায়ী নন বা শেখ হাসিনাও নন। জাতীয় ও দলীয় নাগরিক ও নেতা কর্মীদের এমন চরিত্রের কারনেই গণতন্ত্র দলীয় প্রধানেরা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না। তারেক রহমানও এর বাইরে নন।

নির্বাসনে থাকাকালে তারেক রহমানকেও সেই পদ্ধতি চালু করতে হয়েছে। যেহেতু নির্বাসনের এই সময়কাল বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য নিয়ামক নয়, তাই তিনি নিজের একটি কার্যালয় পর্যন্ত করেন নাই। কারন কার্যালয়ে অন্তত এমনতর নেতা কর্মীদের দায়িত্ব দেয়া যাবে না যাদের কারনে আগামীর বাংলাদেশের রাজনীতি ঝরঝরা হয়ে যায়। যদিও দেশ থেকে আগত অনেক নামি দামি গুরুত্বপূর্ণ নেতাদেরও বিভিন্ন সময়ে নাজেহাল হতে হয়েছে এই কার্যালয় না থাকার কারনে। গড়ে উঠেছে একটি অদৃশ্য চক্র। এ বিষয়ে পরে লেখা যাবে।

বিরোধিতার খাতিরে অনেকেই বিরোধিতা করতে পারেন কিন্তু তাতে বাস্তবতা বদলায় না; তারেক রহমান অন্তত এমন নির্বোধ নন যে তিনি বুঝবেন না কারা বিশ্ব শক্তি কেন্দ্রের দরজার চৌকাঠ চেনার যোগ্যতা রাখেন বা রাখেন না। তাই যারা কূটনৈতিক কোরের নামে দৌড়ঝাঁপ করছে তাদের তিনি নিরুৎসাহিত করেন না। তিনি জানেন কারা আসলে কোথায় আসল কাজ করছেন অন্তরালে থেকে।

এই ট্রিকি রাজনৈতিক পদক্ষেপ দিয়ে তারেক রহমান ভারত এবং আওয়ামী লীগকে ভালই সামলে রেখেছেন। প্রতিপক্ষ দেখছে কিছু অর্বাচীন কাজ করছে আর চেষ্টা করছে তারেক রহমানের উপর ভর করে নিজেদের নাম ফাটাতে। তারা ব্যস্ত থেকেছে এ নিয়ে, তাইতো মুরিদ হয়ে যাওয়া পীরেরাও বিভ্রান্ত হয়। বিভ্রান্ত হয় পুরো অনির্বাচিত নিপীড়ক সরকার। এরই ফাঁকে তারেক রহমান আওয়ামী লীগের বুকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন ‘প্রথম রাষ্ট্রপতি’র দগদঘে ঘা।

চলমান রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ হয়তো অনেক শক্ত অবস্থানে রয়েছে; রয়েছে তাদের বিশাল রাষ্ট্র শক্তি। কিন্তু এর সংখ্যা কত? ১০-১৫ লাখ সরকারী কর্মচারী? আর ১ লাখ সুবিধাভোগী আরও ৫ লাখ পোয়া বা আধা সুবিধাভোগী দলীয় নেতা কর্মী, আরও ৪ থেকে ১০ লাখ সুবিধা না পাওয়া লাফানো নিবেদিতপ্রান সমর্থক কর্মী এবং সর্বোচ্চ ১ কোটি দলান্ধ কিন্তু নির্বিষ নাগরিক। কি দাঁড়ালো? বাকী ১৫-১৬ কোটি মানুষের অবস্থান কি? ভেবে দেখুন। কতদিন আর? তখন নির্বাচন হলে বাকী মানুষগুলো ভোট দেয়ার সুযোগ পেলে কি হবে? বিএনপির নেতৃত্বেই জাতীয়তাবাদী ও দেশপ্রেমিক শক্তির জয়লাভ হবে। আমি ভিন্ন দর্শনের মানুষ হলেও এই চিত্র ঠেকাবো কি দিয়ে? কি দিয়ে ঠেকাবো তখন তারেক রহমানের ক্ষমতা লাভ?

কিন্তু কথা হলো, ক্ষমতা পাওয়া যত সহজ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা এইবার কয়েক হাজার গুন বেশী কঠিন হবে তার জন্য। ইতিহাস হিসেবে জেনারেল জিয়াউর রহমানের পরিনতি মনে রাখতে হবে; শত্রুকে চিনে সঠিক ভাবে না আগালে আর নাবালক আর টারজান টাইপের লোকজন দিয়ে রাষ্ট্র চালানোর চেষ্টা করলে তার ফল কি হবে এটি বোঝেন বলেই তারেক রহমানকে বোঝা কঠিন।

শেখ হাসিনার সরকার ভুল চাল দিয়ে এবং নিম্ন শ্রেণির রাজনৈতিক আইনি কর্মী দিয়ে উল্টাপাল্টা খেলে ইতিমধ্যেই তারেক রহমানকে আরও বেশী জনপ্রিয় করে দিয়েছে। শেখ হাসিনাই তার সরকার দিয়ে তারেক রহমানকে সাফ সুতারা নেতায় পরিনত করে দিয়েছেন। যে কারনে তারেক রহমানের দুর্নীতির কিচ্ছা সাধারন নাগরিক কম বিশ্বাস করে। তবে এতে আপ্লুত হওয়ার কিছু নেই; ইতিহাস থেকে শিক্ষা কেউই নেয় না, দেখা যাক তারেক রহমান কি শিক্ষা নেন ইতিহাস থেকে। (চলবে)

লেখকঃ রাজনীতি, আইন ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

Facebook Comments
SHARE