আসামের ‘শরণার্থী’ সমস্যা : পূর্বানুমান ও পূর্বপ্রস্তুতি

23

ভারতের আসামের নাগরিকপঞ্জি থেকে ৪০ লাখ বাঙালি বাদ পড়েছে। বিজেপি এবং আরএসএস নেতারা তাদের বাংলাদেশী বলে দাবি করে পাঠিয়ে দেয়ার হুমকিও দিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ সরকারকে এ বিষয়ে কালক্ষেপণ না করে এটাকে গুরুত্বের সাথে নিতে হবে। দিল্লির পদক্ষেপ ও বক্তব্যকে বিশ্লেষণ করে এখনই পূর্বানুমান করতে হবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, কতদূর যেতে পারে এই সার্বিক বিবেচনায় একটি কার্যকর পূর্বপ্রস্তুতি ও করণীয় ঠিক করতে হবে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পূর্বপ্রস্তুতি ও অগ্রবর্তী কৌশল গ্রহণকারী দেশ তার কৌশল নির্ধারণে ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকে। বাংলাদেশকে যেন আসামের ৪০ লাখ শরণার্থীর বোঝা কাঁধে নিতে না হয়, বাংলাদেশকে সে চিন্তাই করতে হবে; নাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো বাংলাদেশ স্থায়ী ‘ভুক্তভোগী রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা ইস্যুর ব্যর্থতাকে কেসস্টাডি করে এবং বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল ও মতলবকে বিচার-বিশ্লেষণ করে এগোতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যার মতো ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করলে ব্যর্থতা ছাড়া সফলতা আশা করা যায় না। প্রথমত, আসামের এনআরসির কারণ ও লক্ষ্য সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া, ভারতীয় নেতাদের উচ্চবাচ্যের ব্যাখ্যা চাওয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিষয়টি সামনে আনতে নীরবে সরব প্রচেষ্টা চালানোকে গুরুত্ব দিতে হবে। অগ্রহণযোগ্য ও অস্পষ্ট আশ্বাসে বিশ্বাস করলে রোহিঙ্গাদের মতো আসামের জনগণ এ দেশে এলেও ফেরানো সম্ভব হবে না। ভারতের পররাষ্ট্র দফতর এ বিষয়ে ‘আশ্বস্ত’ করেছে, তবে প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘনের রেকর্ড কম নয়।

ভারতীয় দূতাবাস বাংলাদেশকে ‘ভয়ের কারণ নেই’ বলে আশ্বস্ত করলেও নরেন্দ্র মোদির আসাম নির্বাচনের ইশতেহার ফেলে দেয়া যায় না। বিজেপি আসামকে দখল করার জন্য গত নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ‘বাঙালি (মুসলমান) খেদাও, গেরুয়া ঝাণ্ডা উড়াও’। এ দিকে, সময় সময় আরএসএস নেতা, সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াত বাংলাদেশবিরোধী মন্তব্য অনেক করছেন। এক সেমিনারে রাওয়াত অভিযোগ করেন, ‘ভারতের সাথে ছায়াযুদ্ধের অংশ হিসেবে পাকিস্তান পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশ থেকে আসামে অনুপ্রবেশ করাচ্ছে। পাকিস্তানকে এ কাজে সহায়তা করছে চীন। মূলত ভারতের ওই অঞ্চলকে অস্থিতিশীল রাখতেই অনুপ্রবেশ ঘটানো হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।’ বিজেপি বিধায়ক শিলাদিত্য দেব ‘স্বাধীনতার পরই বাংলাদেশ দখলে’র দরকার ছিল বলে মন্তব্য করেছেন এবং সুব্রাহ্মনিয়াম সিলেট থেকে খুলনা দখলের হুমকি দেন। এত কিছুর পরও আমরা শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় মনে করে এবং তাদের আশ্বাসে বিশ্বাস করে বসে থাকলে বড় ফাঁদে পড়তে হবে হয়তো। আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

ভারতীয় নেতারা হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন। সেখানে ভবিষ্যৎ সঙ্কটটি বিবেচনা করে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে, ব্যাখ্যা চাইতে হবে ভাতের কাছে। কারণ, বিভিন্ন কলাকৌশলে ভারত বিশ্বাস ভঙ্গ করে চলছে স্বাধীনতার পর থেকেই। ১৯৭৪ সালের মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি কার্যকর করতে কত বছর লেগেছে তা সবার জানা। তিস্তা ও গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির প্রতিশ্রুতি আজো নেহায়েত আশ্বাসের ফুলঝুরি। বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট দিলেও নেপালের সাথে বাণিজ্য এবং সার, পাট, ওষুধ রফতানিতে বাধা দিয়েছে আমাদের। ১৯৭৪-এর চুক্তির আলোকে বেরুবাড়ি নিলেও আমাদের তিনবিঘা করিডোর দেয়নি। প্রায় ৩৭ বছর পরে তা উন্মূক্ত হলো ২০১১ সালে।

অভিজ্ঞতা বলে একবার যদি আসামের বাঙালিরা বাংলাদেশে ঢুকেই পড়ে, তাদের ফেরানো সহজ হবে না। তেমনটি হয়েছে মিয়ানমারের ক্ষেত্রে। ১৯৭৪ সালে সামরিক জান্তার ‘নাগামন অভিযান’ আর ১৯৮২-তে ‘নাগরিকত্ব আইনে’র ফলে যে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল বাংলাদেশে এসে পড়েছে তা আর থামানো যায়নি। এত আলোচনা, সমঝোতা, প্রত্যাবর্তনের আশ্বাস কিছুতেই কোনো কাজ হয়নি। আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও সন্তোজনক ছিল না। মিয়ানমার যেভাবে আন্তর্জাতিক মহল ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মৌন সমর্থন পেয়েছে কিংবা তাদের নীরব রাখতে পেরেছে, সেখানে বাংলাদেশের কালক্ষেপণ ও কৌশলগত ব্যর্থতা সমালোচিত হয়েছে বারবারই।

মোদ্দাকথা, বাংলাদেশের পলিসি মেকাররা ইতঃপূর্ব ন্যায্য পাওনা আদায় করতে দিল্লির সাথে সন্তোষজনক দরকষাকরি করতে পারেননি। দশকের পর দশক ধরে মিয়ানমারের সাথে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে বিষয়টি সমাধান করতে ব্যর্থতা দেখিয়েছে। এর অর্থ, কূটনৈতিক দক্ষতা দেখাতে পারেনি। এ অবস্থায় ভারতের সাথেও এ ধরনের শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি হলে কিভাবে দরকষাকরি করবে? এটা কতটুকু করতে পারবে তা জনগণকে সন্দিহান করে তুলছে। কারণ, বাংলাদেশের ওপর মিয়ানমারের তুলনায় ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মিয়ানমারের তুলনায় অনেক বেশি। সব দলই কার্যত দিল্লির বিরাগভাজন হওয়ার ভয়ে নিজেদের ন্যায্য স্বার্থ আদায়ের কথা বলতেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। এ দিকে, ভারত আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন ও হেলসিংকি কনভেনশন লঙ্ঘন করে নানা অজুহাতে বাংলাদেশকে পানি দিচ্ছে না, গড়িমসি করে চলছে। এবার আসামে শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি হলে তারা হয়তো আন্তর্জাতিক শরণার্থী কনভেনশনকে পরোয়া না-ও করতে পারে। তখন কী অবস্থা হবে?

পানি নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যেমন রাজ্য সরকারের ওপর দোষ দিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে, তেমনি আসামের শরণার্থী সঙ্কট সৃষ্টি হলেও এমন গড়িমসি করতে পারে। অভ্যন্তরীণ আইনের দোহাই দেবে তখন। ইতোমধ্যে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির দোহাই দিয়ে মোদি ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’কে বলেছেন, ‘অবৈধ অভিবাসী প্রতিরোধের বিষয়টির মুজিব-ইন্দিরা চুক্তিতে আছে। আমাদের এনআরসি জাতীয় স্বার্থের সাথে জড়িত।’ এতে বোঝা গেল তিনি বাংলাদেশের কাঁধে শরণার্থী চাপানোর জন্য পথ খুঁজছেন। তাই আগেই ভারত যেন কোনোভাবে পুশব্যাক করার সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো- আসামের বাঙালি আসা শুরু করলে রোহিঙ্গা ইস্যু চাপা পড়ে যাবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও নিরাপত্তা তখন বড় ঝুঁকিতে পড়বে। ভারতের সাথে এমনিতেই দীর্ঘস্থায়ী অনেক অমীমাংসিত বিরোধ রয়েছে। এখন অন্য একটি ইস্যু তৈরি হলে পানিবণ্টনের মতো দরকারি বিষয়গুলো গৌণ হয়ে পড়বে। অপার সম্ভাবনাময় উপ-আঞ্চলিক জোট বিসিআইএন এবং বিবিআইএস পরিকল্পনা ব্যাহত হবে। আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে। সে কারণেই সম্প্রতি ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক জয়িতা ভট্টাচার্যের ধারণা, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি ‘টাইম বোমা’র সাথে তুলনীয়। আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ভারত বৃহৎ রাষ্ট্র, তারা কিছু করে ফেললে তা মীমাংসা করতে অনেক সময় লাগবে। তাই আগ থেকেই এমন সমস্যা যেন না হয়, সেজন্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হতে পারে। ভারত সরকারের মনোভাব-মতলব বিশ্লেষণ করা এবং বিজেপির নেতাদের হুমকির প্রতিবাদ জানানো দরকার। তা ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশে কর্মরত দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে বাংলাদেশী প্রতিনিধিদের লবিংয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত করা চাই, আন্তর্জাতিক মহল যেন বিষয়টির প্রতি নজর রাখে।

অনেক বড় রাষ্ট্র বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে আমাদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছে। এখন আবার দক্ষিণ এশিয়ায় আরেকটি বড় শরণার্থী সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে এ সম্পর্কে তাদের অবগত করা উচিত। আরেকটি বিষয় হলো, এ সঙ্কট সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ যে সুপারপাওয়ারদের বড় সমর্থন পাবে তা নয়; বরং অনেক সংগঠন ও রাষ্ট্র ভারতের বিরাগভাজন না হয়ে ‘যতটুকু করা যায়’ তা করবে; এর বেশি নয়। এর দ্বারা সঙ্কটের সুরাহা হবে না। চীনও বাংলাদেশকে বড় সমর্থন দেবে না নানা বিবেচনায়। সুতরাং আমাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি নিজেদেরকেই দক্ষতার সাথে মোকাবেলা করতে হবে। বিষয়টির ব্যাখ্যা চেয়ে দিল্লিকে ‘নোট ভারবাল’ দেয়া দরকার এবং আকস্মিক সঙ্কট মোকাবেলার সম্ভাব্য পরিকল্পনা (কন্টিনজেন্ট প্লান) হাতে নিয়ে এগোতে হবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ (মাস্টার্স), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments
SHARE