সারাদেশে স্যালাইনের তীব্র সংকটে বেকায়দায় সরকার

17

দেশের একমাত্র স্যালাইন উৎপাদনকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে (আইপিএইচ) সিন্ডিকেটের লাগামহীন দুর্নীতি-লুটপাট সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছে। গত এক বছর ধরে মানুষের জীবন রক্ষাকারী স্যালাইনসহ সব ধরনের উৎপাদন সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রেখেছে। এতে সারা দেশে এখন স্যালাইনসহ চিকিৎসার অন্যান্য সরঞ্জামাদির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালগুলোতে স্যালাইনের জন্য হাহাকার চলছে। প্রায় ছ’মাস আগে এই পরিস্থিতি তৈরি হলেও নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। অথচ জনগণের মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবার মতো স্পর্শকাতর এ খাতে সরকার প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হরিলুটের কারণে এর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে না। এ নিয়ে আগেও নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। তবে এবারের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দুর্নীতিবাজ চক্র সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটিকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। বেসরকারি স্যালাইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গোপন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই তারা একদিকে এই সরকারি প্রতিষ্ঠানটির স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ রেখেছে, অন্যদিকে লাগামহীন দুর্নীতি-লুটপাট চালিয়ে প্রতিষ্ঠানটির উ’পাদন ও আর্থিক সক্ষমতা নষ্ট করে দিচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, উপজেলা হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে বারবার চাহিদাপত্র পাঠানো হলেও স্যালাইন মিলছে না। পুশ করার প্রতিটি স্যালাইন সরকারিভাবে উৎপাদন খরচ ২১.৫০ টাকা থেকে ৪২ টাকা। যা রোগীরা সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বিনামূল্যে পেয়ে থাকেন। হাসপাতালে বিনামূল্যে স্যালাইন ও সংশ্লিষ্ট ওষুধ সরঞ্জামাদি সরবরাহ করতে সরকার জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটকে প্রতি বছর বড় অংকের অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকে। কিন্তু সেই স্যালাইনের সাপ্লাই না থাকায় রোগীদেরকে বেসরকারি কোম্পানির উৎপাদিত প্রতিটি স্যালাইন একশ থেকে ২শ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে। তবে, গরীব ও অসহায় রোগীদের তা কেনা সম্ভব হচ্ছে না। এমন অবস্থায় সরকারি প্রতিটি হাসপাতালে চিকিৎসকদের প্রতি রোগীদের চরম আস্থাহীনতা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে নির্বাচনের বছরে সরকারকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সূত্র বলছে, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক, ড্যাব নেতা ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ আজাদের নেতৃত্বে আইপিএইচের পুরোনো দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের লাগামহীন লুটপাটের কারণে দেশব্যাপী স্যালাইনের এমন তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তবে এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ওপেন টেন্ডার না দিয়ে নগদ ক্রয় বা ক্যাশ পারচেজ ও কোটেশনের মাধ্যমে সরকারের কমপক্ষে ১৩ কোটি টাকা লুটপাটের তৎপরতা চলছে। এরই মধ্যে কয়েক কোটি টাকা ইনস্টিটিউটের পরিচালকসহ দুর্নীতিবাজ চক্রের পকেটে ঢুকেছে বলেও জানা গেছে। অভিযোগ আছে, বিএনপি-আওয়ামী লীগ উভয় দিকে সখ্যতা রক্ষাকারী জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট পরিচালক, ড্যাব নেতা ডা. আজাদ পরিকল্পিতভাবে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেই এই চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্যালাইন সংকটের নেপথ্যে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট সিন্ডিকেটের কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য
চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে মুন্সিগঞ্জ জেলা ড্যাবের সাবেক সভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় নেতা ডা. আবুল কালাম মো. আজাদ জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদে যোগদান করেন। অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ এই পদে নিয়োগের পেছনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রভাবশালী ব্যক্তির হাত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যিনি ডা. আজাদের নিকট আত্মীয় এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিশ্বস্ত বলে পরিচিত। যে কারণে বিএনপি ঘরানার চিকিৎসকদের সংগঠন- ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কেন্দ্রীয় নেতা হয়েও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এ পদ বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন ডা. আজাদ। এদিকে বিএনপি-আওয়ামী লীগ দু’দিকেই সখ্যতা রাখা ডা. আবুল কালাম মোহাম্মদ আজাদ যোগদানের পর থেকেই ইনস্টিটিউটের পুরোনো দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের সঙ্গে ব্যাপকভাবে লুটপাটে মেতে ওঠেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একাধিক কর্মকর্তা শীর্ষকাগজকে জানান, বর্তমান পরিচালক এই প্রতিষ্ঠানে ইতিপূর্বে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তখন ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এবং মন্ত্রণালয়ে মোটা অঙ্কের লেনদেনের বিনিময়ে সহকারী পরিচালক (প্রশাসন চলতি দায়িত্বে) পদ বাগিয়ে নেন তিনি। পরে ওই পদে বসে ব্যাপক ঘুষ-দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন ডা. আজাদ। সেই সাথে ড্যাব নেতাদের নিয়ে নিয়মিত আড্ডা জমাতেন অফিসের মধ্যে। এসব অপকর্মের কারণে ২০১৬ সালে মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাকে কুষ্টিয়ায় বদলি করা হয়। পরে মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি, তার কথিত আত্মীয়ের মাধ্যমে প্রভাব খাটিয়ে পুনরায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ফেরেন। অবশ্য এবার তিনি পদোন্নতিও নিয়ে আসেন। সহকারী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) থেকে সহকারী পরিচালক (রেগুলার) এবং রাতারাতি উপপরিচালক পদেও পদোন্নতি বাগিয়ে নেন। শুধু তাই নয়, ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদেও অধিষ্ঠিত হন। পুরোনো কর্মস্থলে পরিচালকের মতো প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদ পেয়ে পূর্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এবং পূর্ব পরিচিত দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের যোগসাজশে বেপরোয়া লুটপাট শুরু করেন ডা. আজাদ।
সূত্র বলছে, সরকারি ক্রয়-নীতিমালার তোয়াক্কা না করে নগদ ক্রয় ও কোটেশন বাণিজ্যের অন্তরালে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রধানের নেতৃত্বে ৩ মাসের ব্যবধানে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে ওই সিন্ডিকেট। ফলে সরকারি বরাদ্দ থাকার পরও স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। অপরদিকে বেসরকারি স্যালাইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ঘুষ লেনদেনের মাধ্যমে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতেই এ কাজ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
উল্লেখ্য, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ল্যাবরেটরিই দেশে একমাত্র সরকারি স্যলাইনসহ ১২ ধরনের স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম উৎপাদন করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে- কলেরা স্যালাইন ১০০০/৫০০এমএল, ৫% ডি/এ স্যালাইন ১০০০/৫০০এমএল, হার্টসম্যান সলিউশন ১০০০/৫০০এমএল, নরমাল স্যালাইন ১০০০/৫০০এমএল, বেবি স্যালাইন ৫০০এমএল, ৩% সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইন, স্যালাইন সেট, ব্লাড ব্যাগ, ব্লাড ট্র্যান্সমিশন সেট, খাবার স্যালাইন। এর মধ্যে পুশ করার বা ইনজেকশন জাতীয় প্রতিটি স্যালাইন সরকারের উৎপাদন খরচ ২১ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৪২ টাকা। জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট উৎপাদনের পর যা সারা দেশের মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ৬৪টি সিভিল সার্জনের অফিসে সরবরাহ করে থাকে। এ জন্য সরকার প্রায় ৪০ কোটি টাকা প্রতিবছর বরাদ্দ দিচ্ছে। এই স্যালাইন তৈরির কাঁচামাল ও কেমিক্যাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে কাঁচামাল আমদানি ও স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ফলে স্যালাইন সরবরাহও প্রায় ছ’মাস ধরে হাসপাতালগুলোতে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে স্যালাইনের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে সারা দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে।
একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারি স্যালাইন না পেয়ে রোগীরা বেসরকারি কোম্পানির উৎপাদিত স্যালাইন এক থেকে দু’শ টাকায় কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। মূলত বেসরকারি কোম্পানিগুলোর থেকে বিশাল অঙ্কের ঘুষ নিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার অপচেষ্টা চালানোর কারণেই আজ দেশের প্রাসিদ্ধ সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিডফোর্ড হাসপাতাল, সোহরওয়ার্দী হাসপাতালসহ ঢাকার ও জেলা হাসপাতালগুলোর গত ছয় মাসের চাহিদাপত্রে দেখা গেছে, কলেরা স্যালাইন, ডেক্সট্রোজ বা গ্লুকোজ স্যালাইন, গ্লুকোজ অ্যাকোয়া স্যালাইন, বেবি স্যালাইন, নরমাল স্যালাইন চাহিদার ১০ শতাংশও সরবরাহ করতে পারেনি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষ। যা স্মরণকালে কখনো দেখা যায়নি। সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শীর্ষকাগজের প্রতিবেদককে এ কথা জানিয়েছেন।
শীর্ষকাগজের কাছে আসা কাগজপত্রে দেখা গেছে, গত ৫ জুন বিভিন্ন ধরনের স্যালাইনসহ ১৫ ধরনের সরঞ্জামাদির চাহিদাপত্র ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঠানো হয় মহাখালী জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে। কিন্তু চাহিদার মধ্যে ১০ ধরনের আইটেম নেই বলে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়। বাকি ৫ আইটেমও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ৫% ডি/এন স্যালাইন ১০০০ এমএল, চাহিদা ছিল এক হাজার ব্যাগের। একটিও সরবরাহ করা যায়নি। ৫% ডি/এন স্যালাইন ৫০০ এমএল, চাহিদা ছিল ১৫শ। একটিও পাওয়া যায়নি। ৫% ডি/এ+ স্যালাইন ১০০০ এমএল, চাহিদা ছিল এক হাজার। পাওয়া গেছে মাত্র ১শ ব্যাগ। ৫% ডি/এ স্যালাইন ৫০০ এমএল, চাহিদা ১৫শ। পাওয়া গেছে ২শ। নরমাল স্যালাইন ১০০০ এমএল, চাহিদা ছিল এক হাজার। একটিও পাওয়া যায়নি। নরমাল স্যালাইন ৫০০ এমএল, চাহিদা ছিল ১৫শ। পাওয়া গেছে ২শ ব্যাগ। কলেরা স্যালাইন ১০০০ এমএল এক ব্যাগও পাওয়া যায়নি। কলেরা স্যালাইন ৫০০ এমএল, চাহিদা ১৫শ। একটিও মেলেনি। হার্টসম্যান সলিউশন ১০০০ এমএল, চাহিদা ৫শ। প্রাপ্তি নেই। বেবি স্যালাইন ৫০০ এমএল, চাহিদা ৫০০ ব্যাগ। একশ ব্যাগ পাওয়া গেছে। এছাড়া, পিডি ফ্লুইড ১০০০ এমএল, ব্ল্যাড ব্যাগ, ব্ল্যাড ট্রান্সমিশন সেট, স্যালাইন সেট চাহিদার বিপরীতে ‘নেই’ উল্লেখ করে জানিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া শুধু সরকারিভাবে উৎপাদন হওয়া ৩% সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইন ২শটি চেয়ে ১শটি পেয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ঢাকা মেডিকেলের ওই চাহিদাপত্রে প্রত্যেক আইটেম হাসপাতালে মজুদের স্থানে নিল বা শূন্য দেখানো হয়েছে।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল গত ১৯ জুন চাহিদাপত্র পাঠায় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক বরাবর। এতে ১২টি আইটেমের মাসিক চাহিদা ও প্রাপ্তি ছিল নি¤œরূপ-
ডি/এন স্যালাইন ৫০০ এমএল, এক মাসের চাহিদা ৫শ ব্যাগ। একটিও পাওয়া যায়নি। কলেরা স্যালাইন ১০০০ এমএল, চাহিদা এক হাজার। প্রাপ্তি নেই। কলেরা স্যালাইন ৫০০ এমএল, চাহিদা এক হাজার ব্যাগ। প্রাপ্তি শূন্য। ৫% ডিএ স্যালাইন ১০০০ এমএল, চাহিদা এক হাজার, একটিও পাওয়া যায়নি। ৫% ডিএ ৫০০ এমএল, চাহিদা ছিল এক হাজার ব্যাগের। প্রাপ্তি নেই। হার্টসম্যান সলিউশন ৫০০ এমএল, চাহিদা ৫শ, প্রাপ্তি ২শ ব্যাগ। নরমাল স্যালাইন ৫০০ এমএল, চাহিদা ছিল ৫শ, পাওয়া গেছে ১শ ব্যাগ। নরমাল স্যালাইন ১০০০ এমএল, চাহিদা ৫শ, প্রাপ্তি ১শ। স্যালাইন পুশিং সেট চাহিদা ৫শটি, প্রাপ্তি শূন্য। ব্লাড ব্যাগ ও সেট চাহিদা ছিল এক হাজার করে। কিন্তু প্রাপ্তির ঘরে শুধুই শূন্য।
এর আগে জুনের ৯ তারিখে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে গ্লুকোজ স্যালাইন ১০০০ সিসি, চাহিদা ২,৫০০ ব্যাগ, ব্যাগ, প্রাপ্তি নেই। গ্লুকোজ স্যালাইন ৫০০ সিসি, চাহিদা ছিল ২,৫০০ ব্যাগ, একটিও পায়নি। গ্লুকোজ অ্যাকোয়া ১০০০ সিসি, চাহিদা ২,৫০০ ব্যাগ, প্রাপ্তি ২শ। গ্লুকোজ অ্যাকোয়া ৫০০ সিসি, চাহিদা ২,৫০০ ব্যাগ, প্রাপ্তি ৩শ। হার্টসম্যান সলিউশন ১০০০ সিসি, চাহিদা ২,৫০০ ব্যাগ, প্রাপ্তি ২শ। হার্টসম্যান ৫০০ সিসি, চাহিদা ২,৫০০ ব্যাগ, প্রাপ্তি ৪শ। নরমাল স্যালাইন ১০০০ সিসি, চাহিদা ২,৫০০ ব্যাগ, প্রাপ্তি ১শ। নরমাল স্যালাইন ৫০০ সিসি, ২,৫০০ ব্যাগ, প্রাপ্তি ৪শ। স্যালাইন সেট চাহিদা ২,০০০ পিস, প্রাপ্তি শূন্য।
এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ১৯ জুন ১৪ আইটেমের চাহিদাপত্র দিয়ে আট আইটেমের আংশিক পেয়েছে। এর মধ্যে গ্লুকোজ স্যালাইন ১০০০ এমএল ২,০০০ ব্যাগ চাহিদার বিপরিতে একটিও পায়নি। গ্লুকোজ স্যালাইন ৫০০ এমএল ২,০০০ ব্যাগ চেয়ে প্রাপ্তি শূন্য। গ্লুকোজ অ্যাকোয়া ১০০০ এমএল ও ৫০০ এমএলের ক্ষেত্রে প্রাপ্তির ঘরে শূন্য দেখা গেছে। নরমাল স্যালাইনের ক্ষেত্রে ১০০০ এমএম ২,০০০ ব্যাগ চেয়ে ২শ ও ৫০০ এমএল সমান সংখ্যক চেয়ে পেয়েছে ৩শ ব্যাগ। হার্টসম্যান স্যালাইন ১০০০ এমএল ও ৫০০ এমএল ২ হাজার করে চেয়ে পেয়েছে যথাক্রমে ২শ ও ৪শ। আর কলেরা স্যালাইন ১০০০ এমএল ও ৫০০ এমএল ২ হাজারের স্থলে মিলেছে ২শ ও ৩শ ব্যাগ। পিডি ফ্লুইড ১০০০ এমএল ২ হাজারের পরিবর্তে ৪শ ব্যাগ মিললেও স্যালাইন পুশিয়েংর একটি সেটও পাওয়া যায়নি। রাজশাহী মেডিকেল বেবি ৫০০ এমএল স্যালাইনও পায়নি।
একই দৃশ্য দেখা গেছে দেশের অন্য মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রেও। এতে সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবায় চরম হতাশা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারি মেডিকেল কর্তৃপক্ষকে। এছাড়া জেলা হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সিভিল সার্জনের অফিসগুলোর অবস্থা আরও খারাপ বলে জানা গেছে। ওই সব প্রতিষ্ঠান থেকে চাহিদাপত্র পাঠিয়ে মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও কোনো স্যালাইন বা অন্যান্য সরঞ্জাম মিলছে না। এক কথায়, সব সরকারি হাসপাতালেই স্যালাইনের মজুদ শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। এতে নিয়মিত হাসপাতালে আসা নিঃস্ব ও অসহায় মানুষের চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন চিকিৎসকরা। আর মধ্যবিত্ত ও নি¤œ মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা তাদের রোগীদের জন্য বাহির থেকে স্যালাইন কিনে আনলেও তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। অনেকেই বিভিন্ন মহলে অভিযোগ জানিয়েও কোনো ফল হচ্ছে না।
জানা গেছে, বর্তমান পরিচালক ডা. আবুল কালাম মো. আজাদ জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে যোগদানের পর বিগত তিন মাসে একবারও প্রোডাকশন ইউনিটে যাননি। তিনি সর্বদা ব্যস্ত কোটেশন ও নগদ ক্রয়ের নামে সরকারি অর্থ হরিলুটের ধান্দায়। যার অংশ হিসেবে গত অর্থবছরের শেষ সময়ে কাঁচামাল, এমএসআর সামগ্রী ক্রয়ের জন্য টেন্ডারে না গিয়ে তিনি প্রায় ৩ কোটি টাকার নগদ কেনার কার্যাদেশ দিয়েছেন। যেখানে সরকারি ক্রয়-নীতিমালা বা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৮-এ ২৫ হাজার টাকার বেশি নগদ ক্রয়ের সুযোগ নেই। আর বছরে ক্যাশ পারচেজে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকার কেনাকাটা করার কথা বলা আছে আইনে।
এছাড়া বিভিন্ন মেশিনারিজ জিনিসপত্রসহ অন্যান্য দু’শটির অধিক ধরনের মালামাল ক্রয় দেখিয়ে ১০ কোটি টাকার বেশি কোটেশন করা হয়েছে। যেখানে পরিচালকের বছরে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকার অধিক কোটেশন করার বিধান নেই। সেখানে টেন্ডার না করে নগদ ক্রয় ও কোটেশনের আড়ালে একসঙ্গে অন্তত ১৩ কোটি টাকা দুর্নীতির মাধ্যমে লুটপাট হয়েছে ডা. আজাদের নেতৃত্বে। এতে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালককে সহযোগিতা করেছেন একই দফতরে দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে কর্মরত হিসাবরক্ষক কর্মকর্তা ও ভুয়া বিল তৈরির ‘মাস্টার মাইন্ড’ হিসেবে পরিচিত মাহবুব এবং তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হয়েও যিনি প্রতিষ্ঠানটিতে গুরুত্বপূর্ণ দুটি (বিক্রয় ও সংগ্রহ কর্মকর্তা এবং স্টোর অফিসার) দখল করে আছেন সেই দুর্নীতিবাজ নিজাম উদ্দিনসহ দফতরের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট।
স্যালাইন উৎপাদন ইউনিটের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা শীর্ষকাগজ প্রতিবেদককে জানান, গত অর্থবছরের ১৫ দিন সময় থাকতে টেন্ডার প্রক্রিয়ার সকল নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে ১০% নগদ ঘুষ নিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৫ কোটি টাকার মালামাল ক্রয়ের কার্যাদেশ দিয়েছেন পরিচালক। যা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। এ জন্য কমপক্ষে তিন মাস সময় দরকার হবে। ওই কর্মকর্তার দাবি, কোনো প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া ১০০ টাকার মালামাল ১,০০০ টাকায় কেনার এই কার্যাদেশের পেছনে ঘুষ বাণিজ্যই মূখ্য।
এখানে উল্লেখ্য যে, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী নিজাম উদ্দিন ২০১২ সালে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ফ্রিজ চুরি করে ধরা পড়েন নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে। পরে এ নিয়ে তদন্ত হয় এবং তদন্তে তিনি অভিযুক্ত প্রমাণিত হন। তদন্ত কমিটি তাকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশও করেন। যার অনুলিপি শীর্ষকাগজের কাছেও রয়েছে। এছাড়া মাহবুব ও নিজাম উদ্দিনসহ জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের একটি দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট সরকারি গোডাউন থেকে নরমাল স্যালাইন, ৩% সোডিয়াম ক্লোরাইড স্যালাইন চুরি করে কালোবাজারে বিক্রি করেও অভিযুক্ত হন। সরকারি জমি দখল করে বাসা তৈরি করে ভাড়া দিয়ে প্রতিমাসে লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি কোটি টাকা খরচ করে বাড়ি করার তথ্যও রয়েছে হিসাবরক্ষক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। কিন্তু জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এই দুর্নীতিবাজ চক্রটি শক্তিশালী হওয়ায় বারবার দুর্নীতি করেও তারা শাস্তির পরিবর্তে পদোন্নতি পেয়েছেন এবং একই স্থানে বছরের পর বছর কর্মরত রয়েছেন। এতে দিনে দিনে তাদের দুর্নীতি ও লুটপাট লাগাম ছাড়িয়েছে। আর যখন যিনি প্রতিষ্ঠানটিতে পরিচালকের পদে থাকেন তিনিই নেতৃত্ব দেন সরকারি সম্পদ মাধ্যমে হরিলুটে।
স্যালাইনের সংকট : জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে দুদকের অভিযান
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) টিম গত ১ জুলাই মহাখালীতে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে আকস্মিক অভিযান চালিয়েছে। উপ-পরিচালক সাহিদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট টিম স্যালাইন উৎপাদনকারী এই সরকারি প্রতিষ্ঠানে বেলা ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে। দুদক অভিযোগ কেন্দ্রে ১০৬-এ ফোন করে ভুক্তভোগী জনসাধারণের পক্ষ থেকে অভিযোগের প্রেক্ষিতে এ অভিযান চালানো হয়েছে বলে দুদকের গণসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানিয়েছেন। তিনি জানান, অভিযানকালে দুদক টিম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে বেশ কিছু অনিয়মের সন্ধান পায়। এ সময় ওই প্রতিষ্ঠানের পরিচালকও উপস্থিত ছিলেন।
দুদকের কাছে অভিযোগ আসে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিতে গত এক বছরে স্যালাইন উৎপাদন প্রায় বন্ধ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে কাঁচামাল ক্রয় বন্ধ রাখায় স্যালাইন উৎপাদন শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে স্যালাইন উৎপাদন বন্ধ রেখে বেসরকারি স্যালাইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে রমরমা বাণিজ্যের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানে স্যালাইনের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে।
অভিযানকালে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. আবুল কালাম মো. আজাদ স্বীকার করেন, কাঁচামাল কিনতে না পারায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, গত অর্থবছরে এ প্রতিষ্ঠানের বাজেটের ৮ কোটি টাকা ফেরত গেছে। কিন্তু, আরও বিভিন্ন খাতে প্রতিষ্ঠানের যে কোটি কোটি টাকা খরচ দেখানো হয়েছে সেগুলোর যৌক্তিকতা সম্পর্কে কোনো প্রশ্নের জবাব দিতে পারেননি পরিচালক ডা. আজাদ।
অভিযান পরিচালনা প্রসঙ্গে এনফোর্সমেন্ট অভিযানের সমন্বয়কারী দুদকের মহাপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী তাৎক্ষনিক এক প্রতিক্রিয়ায় গণমাধ্যমকে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হলেও কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন। অবিলম্বে এ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ক্ষমতার পূর্ণ সদ্ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গোচরে আনা হবে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কোনো যৌক্তিক কারণ ও ভিত্তি ছাড়া উৎপাদন বন্ধ রাখাও এক ধরনের দুর্নীতি। অনুসন্ধানে এ দুর্নীতি প্রমাণিত হলে দুদকের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ৯ জুলাই ২০১৮ প্রকাশিত)

Facebook Comments
SHARE