তারেক রহমানের নেতৃত্বঃ সম্ভাবনা ও বাস্তবতা- ১

37

শেখ মহিউদ্দিন আহমেদঃ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র নির্বাসিত নেতা তারেক রহমান। তার পক্ষে বিপক্ষে হাজারো মিথ রয়েছে । একজন রাজনৈতিক নেতার পক্ষ বিপক্ষের মিথের সত্যতা যাচাই করার এখতিয়ার কেবলমাত্র জনগণের, কারন লেখক বা সাংবাদিকের কলামে পক্ষপাতিত্ব থাকবেই। তবুও তারেক রহমানের বিষয়ে বলতে গেলে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্য এবং তাড়নাকে সামনে এনে বিশ্লেষণ করলেই তার সম্পর্কে অনেকখানি বলা হয়ে যায়। রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তিনি জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে, নইলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা তাকে বার বার টার্গেট করছে কেন? কেন তাকে দেশে এসে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ দিচ্ছে না? সেটি কি তার গুরুত্বকে প্রকাশ করছে না?

অবশ্যই তারেক রহমান বিএনপির রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার পরে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। এটি হলো রাজনৈতিক বাস্তবতা। এই জনপ্রিয়তার আবেগে বিএনপির যুব সমাজকে তাড়িত করছে প্রতিনিয়ত। তারেক রহমানের চলমান জনপ্রিয়তা বিএনপির অন্যান্য নেতাদের ব্যর্থতার কারনে একমাত্র সম্ভাবনা হিসেবেই দেখছে সকল মহল। এজন্য বাংলাদেশের জনগণের সামন্ততান্ত্রিক ধ্যানধারণার প্রভাব অপরিসীম, যা থেকে বেরিয়ে এসে ভিন্ন কোন মাত্রা দেয়া সম্ভব নয় আগামী কয়েক দশকেও। যে কারনে তারেক রহমানের জনপ্রিয়তাও কমার সম্ভাবনা নেই। আর আওয়ামী গংদের পরশ্রীকাতরতা ও তারেক রহমানকে রাষ্ট্র যন্ত্র দিয়ে প্রতিহত ও প্রতিবন্ধতা সৃষ্টির অব্যাহত চেষ্টার কারনে এ মাত্রা কমার লক্ষন সুদুর পরাহত। মোট কথা সামন্ততান্ত্রিকতা দিয়ে কাউকে স্তব্দ করা সম্ভব নয়।

আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে চলমান ব্যক্তিতান্ত্রিক ও সামন্তাতান্তিক এই রাজনৈতিক মানসিকতা ও সিস্টেমকে অপছন্দ করলেও দেশে মানুষদের চারিত্রিক এই বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। যে কারনে রাজনীতিতে এই সামন্তধারা অব্যাহত থাকবেই। যদিও কেবলমাত্র বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান সঠিক গণতান্ত্রিক ধারা প্রবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু কালের আবর্তে তার হত্যার মধ্যদিয়ে তা তিরোহিত। জাতি নিজ শ্রেণির কাউকে নেতা হিসেবে দেখার মত জেনেটিক ধারা বহন না করার কারনে দলের ঐক্য বজায় রাখতেই নেতা নেত্রীদের সন্তানদের কদর ও জনপ্রিয়তা সবসময় চাঙ্গা থাকে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে এর বিপরীত কিছু নেই। ব্রিটিশ রাজপরিবারকে আজো ঐক্যের প্রতীক হিসেবেই ব্রিটিশ জাতি বহন করে চলেছে। সে ক্ষেত্রে তারেক রহমানের রাজনীতিতে অবস্থান এবং দীর্ঘদিন দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে সুসংহত করেছে নিঃসন্দেহে।

আমি বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নই; এমনকি বিএনপির কোন বেনিফিসিয়ারিও না; দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছি বিএনপি সরকারের সময়ে তাদের মাফিয়া স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর ও কুখ্যাত এসপি কহিনুর ও আক্কাস ভুইয়ার দ্বারা হত্যা চেষ্টা ও নির্মম শারীরিক নির্যাতনের কারনে। এমনতর অসভ্য ও অমানবিক আচরনের পরে আজো কেউ ক্ষমা না চাওয়া সত্বেও তারেক রহমান সম্পর্কে লিখছি নির্মোহভাবে। লেখাটি হবে ধারাবাহিক। এতে কে খুশি হলেন আর কে বেজার হলেন তাতে আমি কোন ভ্রুক্ষেপ করছি না। বিএনপি আবারো ক্ষমতায় গেলে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন নিঃসন্দেহে; এ ক্ষেত্রে তার কাছ থেকে কখনই কিছু প্রত্যাশা আমার নেই, আবারো ক্রসফায়ারে পাঠালেও ভয়ে কম্পিত নই।

যাক যা বলছিলাম, আমি তারেক রহমানের সাথে একাধিকবার মিলিত হয়েছি, কথা হয়েছে। তার সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষীদের সাথে যেমন, তেমনি ভবিষ্যতে খুদকুঁড়ো লাভের প্রত্যাশি শুভাকাঙ্ক্ষী বেশে থাকাদের সাথেও কথা বলেছি, দেখেছি কাছ থেকে; কথা হয়েছে হচ্ছে প্রবাসী ও দেশে অবস্থানরত বিএনপির ও বিএনপির বাইরের নেতা কর্মীদের সাথে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমার ক্ষুদ্র অবস্থানকে জাতীয়তাবাদী অনেকেই পছন্দ করেন বিধায় নির্দ্বিধায় তারা বলেন অনেক সত্য যা তারা কখনই তারেক রহমানকে বলবেনই না। কারন তারা ভাবেন নেতারা শুধু ভালটুকুই শুনতে চান, আর কাছে অবস্থান করা কাউকে অবিশ্বাস করেন না; যদিও ইতিহাস বলে যে সকল নেতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন, তা তাদের ভুল লোক নির্বাচন আর সেই ভুল বা অনুপ্রবেশকারীদের দ্বারাই হয়েছে। এটি নেতাদের সীমাবদ্ধতা, দোষের নয়। ইতিহাস নির্ধারণ করবে তারেক রহমানের এই সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিনা; বিগত দিনের কোন ভুল সিদ্ধান্ত তাকে আজো বিধ্বস্ত করছে কিনা, করলে তা তিনি পরিহার করতে পেরেছেন কিনা? এটি তার বিষয় তাই এ বিশ্লেষণে আমি যাবো না।

তারেক রহমানের রাজনীতির শুরুটা ছিল বর্নাট্য এবং সম্ভাবনার। শুরুতেই তিনি সংগঠনে চমকপ্রদ কিছু কাজ দেখিয়েছেন। সংগঠিত ও প্রশিক্ষিত করতে চেষ্টা করেছেন তৃনমূলকে নিজের আঙ্গিকে, যে কোন কারনেই হোক তিনি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার পিতা জেনারেল জিয়ার ধ্যান ধারনাকে পাশ কাটিয়ে গেছেন। পুনরুজ্জীবিত করেননি পিতার রাজনৈতিক স্কুলকে। তবুও জেনারেল জিয়ার বিপুল জনপ্রিয়তাই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে; দলে তার সামনের পথকে অপ্রতিদ্বন্দ্বি করেছে। কিন্তু আমার হিসেবে একটি কাজ না করে তিনি নিজেকে অসম্পূর্ণ করে রেখেছিলেন, সেটি হলো কোন সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করা। নির্বাচনে দাঁড়ালে ইতিহাস বলে তিনি নির্বাচিত হতেন; আর সেই কারনেই হয়তো আজকের ইতিহাসটিও ভিন্ন মাত্রা পেতো। (চলবে)

লেখকঃ রাজনীতি, আইন ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

Facebook Comments
SHARE